লেখকঃ ছালেহ আহমদ

ফেনী জেলার দাগনভূঞাঁ থানার ২নং রাজাপুর ইউনিয়নে আমার বাড়ি। ছোট্ট বেলা থেকেই ধর্ম কর্মের প্রতি আসক্ত ছিলাম। সে সুবাদে একটি ইসলামী ছাত্র সংগঠন আমাকে তাদের দলে টেনে নেয়। আমি ক্রমান্বয়ে ওই দলের মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠি। এ দেশের মুসলমানদের আচার-আচরণে র্শিক, বিদ্‘আতের গন্ধ পেতে শুরু করি।

১৯৭৭ ইংরেজী এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ করে মামার বাসায় বেড়াতে যাই। মামার বাসা ছিল ঢাকা ইব্রাহীমপুর এলাকায়। মামা-মামী উভয়ই পীর ধরা লোক। পীর-মুরীদি কিন্তু আমার প্রধান অপছন্দের জিনিস। এ বিষয়ে তাদের সাথে আমার বিতর্ক লেগে যায়। বিতর্কের এক পর্যায়ে তাঁরা আমাকে বললেন, তোর খোদা নিয়ে তুই থাক। এতে আমি রাগ করে বাসা হতে বের হয়ে যাই। অজানা অচেনা ঢাকা শহরে কোথায় যাবো, কোথায় থাকবো? অবশেষে মসজিদে আশ্রয় নিই। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, এখন কি আর সত্যিকারের মুরশিদ আছে? থাকলে হয়তো দূর অতীতে কখনো ছিল। এ ভাবনায় নিদ্রা এলে স্বপ্নে ধবধবে সাদা পাগড়ি আর সাদা পোষাকের এক মহাপুরুষের দর্শন লাভ করি। তাঁর সাক্ষাৎ লাভের পর থেকে আমার অন্তর হতে পীর-মুরশিদের প্রতি বিদ্বেষভাব কমতে থাকে।

অতঃপর কেটে গেল কয়েক বছর। ৮২ ইংরেজীর দিকে ফের স্বপ্নে দর্শন লাভ করি ওই বুযুর্গের। এবার দেখলাম তিনি গেঞ্জি আর লুঙ্গি পড়া। তিনি আমাকে একটা ফুঁক দেন। এ দর্শনের পর থেকে আমার মনে পীর-আওলিয়াদের জীবনী পাঠের আগ্রহ জমে। এ ধারাবাহিকতায় ফরিদুদ্দীন আত্তার (রা.)’র তাযকিরাতুল আওলিয়া পাঠ করি। এ পুস্তক পাঠে পীর মুরশিদের শিষ্যত্ব গ্রহণের চিন্তা-চেতনা জাগে অন্তরে। যেহেতু আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (দ.) কে চিনতে-জানতে-পেতে হলে একজন পীরে কামিলের সান্নিধ্যের প্রয়োজন। কিন্তু কোথায় পাবো পীরে কামিল? অন্তরের অবস্থাদি জেনে অন্তরের চিকিৎসা করতে পারেন, এমন পীর-মুরশিদের সন্ধানে অবতীর্ণ হই ১৯৮৪ সালে। বেশ কয়টি দরবার ঘুরে দেখলাম, কিন্তু কাঙ্খিত ধন পাইনি।
১৯৮৫ সালের জুন মাস। তখন আমি চট্টগ্রামস্থ পাঁচলাইশ থানার শোলকবহর এলাকায় ছোট্ট একটি পানের দোকান করতাম। একই এলাকায় থাকতেন ফটিকছড়ি থানার কাঞ্চনপুরের রংমিস্ত্রী বদিউল আলম। তার সাথে আলাপ চারিতায় তার পীর-মুরশিদ আছেন, জানতে পারি। আমি নিজের ইচ্ছা-অভিলাষের কথা তাকে সবিস্তারে জানাই। সে তার পীরকে ফরাক করে দেখতে বললে আমি প্রস্তাব লুফে নিই। অমনি তাকে নিয়ে যাত্রা দিলাম তার পীর সাহেবের সাক্ষাৎ উদ্দেশ্য।

হারুয়ালছড়ি গাউসিয়া রহমানিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠাতার অফিস কক্ষে পৌঁছে বদিউল আলমের পীরকে দেখে আমি বিস্মিত। উনিতো আমার স্বপ্নদর্শিত সে সুপুরুষ; যার প্রথম স্বপ্ন-দর্শনে আমার অন্তর হতে পীর-আউলিয়ার বিদ্বেষ বিদূরীত হয় এবং দ্বিতীয় বারের সাক্ষাতে আউলিয়া চরিত পাঠের আগ্রহ, পীর-মুরশিদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব ও সত্যিকারের পীরের অনুসন্ধান-চেতনা সৃষ্টি হয়।

পীর সাহেব আমাকে দেখামাত্র বললেন, তুমি এত বিলম্ব করলে কেন? তিনি স্বপ্নে দেখার পর আসতে দেরি করার বিষয়ে ইঙ্গিত করছেন বলে ধারণা হল। তবুও অবুঝ মন অলৌকিকতা প্রত্যাশা করল। অমনি উপস্থিত ছাত্রদের বিদায় করে দিলেন। যেহেতু সহযাত্রী বদিউল আলম ও হুযূর ব্যতীত অন্য কেউ আমার বিষয়টি জানুক, তা আমি মনে-মনে অপছন্দ করছিলাম। বিলম্বের কারণ জিজ্ঞাসা ও ছাত্রের বিদায় কাকতালীয়ও হতে পারে ভাবলে প্রস্থানরত ছাত্রদের একজন অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তাকে শিক্ষক মিলনায়তনে নিয়ে রাখা হলে হুযূর তথা গিয়ে তার ক্বলবের স্থানে হাত রাখতেই সে জ্ঞান ফিরে পায়।

অতঃপর তিনি আপন কক্ষে প্রত্যাবর্তন করে আমরা কিছু বলার আগেই বললেন, যাও আরো একটু চিন্তা-পর্যবেক্ষণ কর, তাড়াহুড়া ভাল নয়। অতএব আমি আপন গন্তব্যে ফিরে আসি।
দরবার শরীফ হতে প্রত্যাবর্তনের পর একদা যুহরের নামায আদায় কালে দেখি, হুযূর সশরীরে আমার সামনে উপস্থিত। তাঁর বক্ষমোবারক আয়নার মতো স্বচ্ছ। এটা অবলোকনে আমি আর নামায শেষ করতে পারিনি। দু’নয়নে ঝরণা বইতে শুরু করল আর হৃদয়ে ঝড়। অস্থির মন ব্যাকুল হয়ে ওঠলো, তাঁর সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য। এমন শায়খের ক্বদমে নিজেকে সপে দিতে অন্তরে কোন সংশয় রইলনা।

আবার গেলাম দরবারে। শুক্রবার দিন সকাল ৮টায় আমার মনের কথা বিস্তারিত জানিয়ে মনোপ্রাণ সপে দিলাম মুরশিদ মাওলার চরণে। তিনি আমাকে শিষ্যত্বে বরণ করলেন।