লেখকঃ আল্লামা বোরহান উদ্দীন মুহাম্মদ শফিউল বশর।

আকাশের নীল চাদরের নীচে, ভূপৃষ্ঠের ধূসর মাটির বুকে, কত মুকুল অকালে ঝরেছে, কত ফুল ফুটে ঝরে শুষ্ক হয়েছে, কত ফুলের শোভা আছে সৌরভ নাই, কত ফুলের সৌরভ আছে শোভা নাই; কিন্তু নিবন্ধের প্রতিপাদ্য দুই পুস্প চিরসজীব-চিরসতেজ, চিরসুন্দর-চিরসুরভিত। এ ফুলদ্বয়ের সৌন্দর্যের না তুলনা আছে, না সুগন্ধির উপমা। এ দু’টি বাগে রেসালতের ফুল, উনাদের নাম হাসান ও হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা। হাদীসের ভাষায়-هما ريحانىّ من الدنيا ‘এ দুইজন দুনিয়া থেকে নির্বাচিত আমার দু’টি ফুল’ (বুখারী ও তিরমিযী শরীফের উদ্ধৃতিতে মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৬৯-৫৭০)।
এ দুইজন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র নয়ন জ্যোতি, মাওলা-এ কায়েনাত (রা.)’র হৃদয়-প্রশান্তি ও খাতুনে জন্নাত (রা.)’র আত্মজ। নানাজান নবীকুল সম্রাট, আব্বাজান অলিকুল সম্রাট, আম্মাজান রমণীকুল সম্রাট আর সন্তানদ্বয় হলেন বেহেশতের যুবককুল সম্রাট। হাদীসে পাকের ভাষ্যে- الحسن والحسين سيّدا شباب اهل الجنّة ‘হাসান ও হুসাইন জন্নাতী যুবকদের সরদার’ (তিরমিযী শরীফের উদ্ধৃতিতে মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৭০ পৃষ্ঠা)। তাঁদের একজনের পোষাক নীলাভ আর অন্যজনের রক্তিম। একজন বিষ প্রয়োগে শহীদ হন আর অন্যজন তীর-তরবারী-বল্লমের আঘাতে। একজন বিষের পেয়ালা পান করে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন আর অন্যজন বর্শাগ্রে চড়ে কুরআন পড়েছেন। একজন নিজের খেলাফতের মুকুট দিয়ে ইসলামকে ফিৎনা-ফ্যাসাদ হতে রক্ষা করেছেন, আর অন্যজন নিজের সবকিছু উৎসর্গ করে ইসলামের সম্ভ্রম বাঁচিয়েছেন। এ দুইজনের ত্যাগ না হলে না আজ বায়তুল্লাহর তাওয়াফ চলতো, না মসজিদে আযান হতো, না মুসাল্লায় মুসল্লী থাকতো, না মিম্বরে কুরআন আবৃত্তি হতো। সত্যিই এ দুইজনের কুরবানী না হলে ধরাপৃষ্ঠে ইসলামই জীবন্ত থাকতোনা। ড. আল্লামা ইকবাল যথার্থই বলেছেন, اسلام زنده هوتاهى هر كربلا كى بعد ‘ইসলাম যিন্দা হয় প্রতিটি কারবালার (কারবালার ত্যাগবৎ মহান ত্যাগের) পর’।

ফয়যে নবূয়ত ও রেসালতের স্থায়ীত্বের ঐশী ব্যবস্থাপনা: হযরত ইব্রাহীম (আ.) ফরিয়াদ জানিয়েছিলেন যে, হে প্রভু! আমার বংশে খাতামুল আম্বিয়া সৃজন করুন এবং আমার বংশধরকে ইমামত দান করুন। অতএব হযরত মুহাম্মদ (দ.)’র আকৃতিতে শেষনবী তশরীফ আনলেন। তাঁর ওপর নবূয়তের পরিসমাপ্তি ঘটলে আবশ্যক হয়ে পড়ল যে, হুযূর রহমতে কাওনাইন (দ.)’র নবূয়তের ফয়য ইমামত-বেলায়তের আকৃতিতে চলমান থাকা; যাতে ইব্রাহীম (আ.)’র বংশে ইমামত-বেলায়তও সন্নিবেশিত হয়। হুযূর (দ.)’র ঔরস্য পুত্র বিদ্যমান ছিলনা ঠিক, পরন্তু ওই ধারার প্রবাহতো আটকে থাকতে পারেনা। সুতরাং আল্লাহ তা’আলার নির্বাচনের দৃষ্টি হুযূরের প্রিয় কন্যা খাতুনে জন্নাত ফাতেমাতুযযাহরা (রা.) ও মাওলা-এ কায়েনাত আলী (রা.)’র ওপর পড়ল। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি ও চাহিদা মতে ওই দুই মহান সত্তা বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। হাদীসে পাকের ভাষায়, عن عبد الله بن مسعود عن رسول الله صلّى الله عليه وسلم قال ان الله امرنى ان ازوج فاطمة من على رضى الله عنهما- ‘আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (দ.) এরশাদ করেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা আমাকে হযরত ফাতেমা (রা.)’র বিবাহ হযরত আলী (রা.)’র সাথে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন’ (আল্ মু’জামুল কবীর লিত্ত্ববরানী ১০৩০৫ নং হাদীস)।

দুই শাহযাদার জন্ম: আবূ মুহাম্মদ হাসান (রা.)’র জন্ম ১৫ রমযান, ৩ হিজরী, সোমবার। আবূ আব্দুল্লাহ হুসাইন (রা.)’র জন্ম ৫ শা’বান ৪ হিজরী। (তারীখুল খুলফা ও শহীদ ইবনে শহীদ)

অভূতপূর্ব শ্রুত নাম: মুস্তফা (দ.) খাতুনে জন্নাত (রা.)’র গৃহ আলো করা দুই চাঁদ, মাওলা আলী (রা.)’র বাগিচার শোভা দুই ফুল আর নবূয়তী ঝরণা-উৎসরিত দুই মহাসমুদ্রের নাম রাখলেন, হাসান ও হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা। এ নাম দু’টি তৎপূর্বে বিশ্বে পরিচিত ছিলনা। قال المفضل: ان الله حجب اسم الحسن والحسين حتى سمى بهما النبى صلى الله عليه وسلم ابنيه ‘মুফাদ্দল বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ হাসান ও হুসাইনের নাম পর্দাড়ালে রেখেছেন, যাবৎনা নবী করীম (দ.) তাঁর দৌহিত্রদ্বয়কে ওই দুই নামে নামকরণ করলেন’। (তারীখুল খুলফা ১৪৯ পৃষ্ঠা)

বংশধর হওয়ার ক্ষেত্রে অনন্যতা : প্রত্যেক ব্যক্তির বংশধর হয়ে থাকে আপন ঔরস্য কিংবা পুত্রের ঔরস্য। পরন্তু নবী (দ.)’র বংশধর হওয়ার ক্ষেত্রে এ দুই মহাপুরুষ পরিপূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। এরা না নবীর ঔরস্য, না নবীর পুত্রের ঔরসজাত; বরং নবীর অছির ঔরসজাত এবং নবীর আত্মাজার আত্মজ। মহানবী (দ.) মাওলা আলী (রা.) কে কেন্দ্র করে বলেন, ان الله عزّ وجلّ جعل ذريّة كل نبى فى صلبه وان الله جعل ذريتى فى صلب على بن ابى طالب رضى الله تعالى عنه ‘আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল্লা প্রত্যেক নবীর বংশধর তাঁদের ঔরসে চালু রেখেছেন আর আমার বংশধর আলী বিন আবী ত্বালিবের ঔরসে জারী রাখবেন’। (আল্ মু’জামুল কবীর ২৬৩০ নম্বর হাদীস)। হাসান ও হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমাকে কেন্দ্র করে বলেন, هذان ابناى وابنا ابنتى ‘এ দুইজন আমার ছেলে এবং আমার মেয়ের ছেলে’ (তিরমিযী শরীফের বরাতে মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৭০ পৃষ্ঠা)।

নবী (দ.)’র সর্বাধিক প্রিয়: হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা ছিলেন নবী (দ.)’র সর্বাধিক প্রিয়। হাদীসের বর্ণনায় রয়েছে, سئل رسول الله صلى الله عليه وسلّم اىّ اهل بيتك احب اليك قال الحسن والحسين ‘রাসূলুল্লাহ (দ.) কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, আপনার আহলে বায়তের কে আপনার নিকট অধিক প্রিয়? প্রত্যুত্তরে নবী বললেন, হাসান ও হুসাইন’ (মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৭১ পৃষ্ঠা)।

দুই মহান মল্লযোদ্ধার দুই সম্মাতিন কোচ: যাহরার গুলিস্তানের দুই কচি ফুল একদা পরস্পর কুস্তী লড়ছে। নবী করীম (দ.) আপন স্নেহধন্য কন্যার নিকট বসে তাঁদের খেলা দেখছেন। অতঃপর হাসানকে বললেন, হাসান! হুসাইনকে এ ভাবে পাকড়াও কর। সৈয়্যদাহ আশ্চর্য হয়ে নিবেদন জানালেন, আব্বাজান আপনি বড়জনকে বলছেন যে, ছোট্ট ভাইকে পাকড়াও করতে! নবী মুদৃহাস্যে বললেন, হ্যাঁ বেটী! অপরদিকে জিব্রাঈলও হুসাইনকে বলছে যে, হাসানকে এরূপ পাকড়াও কর। (শাওয়াহিদুন্ নবূয়ত ৩০৪ পৃষ্ঠা)।

আকৃতি-প্রকৃতিতে নবীর প্রতিবিম্ব: নবী করীম (দ.)’র এ দুই দৌহিত্রের আকৃতি-প্রকৃতির বিশদ বর্ণনা দিতে গেলে সহস্র পৃষ্ঠাও কিছুনা। সংক্ষেপে বলতে গেলে এরূপই বলা যায় যে, আল্লাহর রূপ-গুণের প্রত্যক্ষ করতে হলে দর্পণ হল মুস্তফা (দ.)’র সৌন্দর্য; আর মুস্তফা (দ.)’র আকৃতি-প্রকৃতি দেখতে চাইলে আয়না হল হাসান ও হুসাইন। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর পূর্ণবিকাশ নবী আর নবীর সুরত-সিরতের পরিপূর্ণ বিকাশ দৌহিত্রদ্বয়। আল্লাহর প্রভুত্ব প্রকাশের হেতু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ আর রাসূলের শানে মুস্তফায়ী প্রকাশের বিশেষ কারণ হাসনাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা। নবী করীম (দ.) ছিলেন যিল্লে খোদা আর দুই দৌহিত্র ছিলেন যিল্লে মুস্তফা। এটি শুধু উপমা মাত্র নয়, বরং বাস্তবতা যে, নবীর দুই শাহযাদা আপন নানাজানের পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছায়া-প্রতীক। হাদীসের বর্ণনায় রয়েছে, عن على قال الحسن اشبه رسول الله صلّى الله عليه وسلم ما بين الصدر الى الراس والحسين اشبه النبى صلى الله عليه وسلم ما كان اسفل من ذالك- ‘হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাসান মস্তক হতে বক্ষ পর্যন্ত আর হুসাইন তৎনিম্নভাগ তথা বক্ষ হতে পা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (দ.)’র পরিপূর্ণ সাদৃশ ছিলেন’। (মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৭১ পৃষ্ঠা)
এ দৌহিত্রদ্বয় আকৃতিতে যেমন নবীর প্রতিচ্ছবি, তেমনি প্রকৃতিতে নবীর মূর্তপ্রতীক। তারা উভয় ওই নূরের দর্পণ, যাতে জমালে মুস্তফায়ী পরিপূর্ণ রূপে প্রত্যক্ষ করা যায়। কথায় ওই মিষ্টতা-স্বাদ, কর্মে ওই দৃঢ়তা ওই আলো, চেহরায় ওই নূর ওই পবিত্রতা, চলনে ওই মহত্ত্ব ওই গাম্ভীর্য, বক্ষে ওই বিশুদ্ধতা-পরিচ্ছন্নতার তরঙ্গমান সাগর, হৃদয়ে ওই করুণার উচ্ছ্বাস ও দানশীলতার প্রবাহমান ঝরণা।
নবী-আনুগত্যের মূর্তি দেখতে চাইলে তাঁদের দেখ, নবীর সুন্নাতের প্রতীক দেখতে চাইলে তাঁদের দেখ।

হাসান (রা.)’র ধৈর্য, সহনশীলতা ও দানশীলাতা: হযরত দাতা গঞ্জে বখ্শ লাহুরী (রা.) বলেন, আমি কাহিনীমালায় পড়েছি যে, একদা কোন গ্রাম হতে ইমাম হাসান (রা.)’র নিকট এক গ্রাম্য লোক এল। এমতাবস্থায় তিনি কূফায় নিজ গৃহের দরজায় বসা ছিলেন। আগন্তুক এসেই তাঁকে এবং তাঁর মাতা-পিতাকে অকথ্য ভাষায় গালি দিতে শুরু করল। তিনি ওঠে তার নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি ক্ষুধার্ত, না পিপাসার্ত, না তোমার অন্য কোন সমস্যা আছে? গ্রাম্য লোকটি ফের মা-বাপ ধরে আচ্ছা মতো গালি দিল। অতঃপর ইমাম আপন ভৃত্যকে বললেন, ভিতর থেকে চাঁদির থলেটি নিয়ে এসো। ইমাম লোকটির হাতে থলে তুলে দিয়ে অক্ষমতা জানালেন যে, আমার নিকট এখন গৃহে এ ছাড়া আর কিছু নেই, যদি থাকত তোমাকে দিতে কার্পণ্য করতামনা। এতদশ্রবণে লোকটি বলল, اشهدانك ابن رسول الله ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি রাসূলুল্লাহ (দ.)’র আওলাদ’। আমি এখানে আপনার সহনশীলতা পরীক্ষা করতে এসেছি; এ গুণ দৃঢ়চেতা মশায়িখদেরই হয়ে থাকে। কেননা তাঁদের নিকট মানুষের প্রশংসা ও নিন্দা সমানই হয়ে থাকে, কটু কথায় তাঁদের স্বভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটেনা। (কশফুল মাহজূব উর্দু ১৪৪ পৃষ্ঠা)
‘তিনি গালির বিনিময়ে দিলেন চাঁদিভরা থলে!
পুস্পমাল্যের বিনিময়ে দিই মোরা অর্ধচন্দ্র গলে!’

ইমাম হুসাইন (রা.) কর্তৃক শ্রদ্ধা-অভিবাদনের প্রতিদান : ইমাম হুাসাইন (রা.)’র এক দাসী তাঁকে সুগন্ধ ফুলের একটি পুস্প-তোড়া-উপহার দেয়। এতে তিনি ওই দাসীকে আযাদ করে দেন। এতদদর্শনে হযরত আনাস (রা.) বললেন, ইমাম! আপনি একটি পুস্প তোড়ার বিনিময়ে দাসী আযাদ করে দিলেন! প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ! আল্লাহ তা‘আলার ঘোষণা-اذاحيّيتم بتحيّة فحيوا باحسن منها ‘যখন তোমাদের কোনরূপ অভিবাদন জানায় তবে তোমরা তার চেয়ে উত্তম অভিবাদন বিনিময়ে দিও’। সূরা নিসা ৮৬ নম্বর আয়াত। (সূত্র শহীদ ইবনে শহীদ প্রথম খণ্ড ৪৭ পৃষ্ঠা)।
উল্লেখ্য যে, দাসী তার সামর্থ অনুযায়ী শ্রদ্ধাভিবাদন জানিয়েছে আর ইমাম আপন শান অনুসারে উত্তম প্রত্যুত্তর দিয়েছেন। একশ্রেণীর আহম্মক সূরা নিসার উক্ত আয়াত উদ্ধৃত করে বলে, মুরীদ পীরকে একবার সিজদাহ-এ তাহিয়্যাহ করলে, পীর মুরীদকে দু’বার করতে হবে! পরন্তু ইমাম হুসাইন (রা.) প্রমাণ গ্রহণের আলোকে সুস্পষ্ট যে, প্রত্যুত্তর সমজাতীয় হওয়া শর্ত নয়। এমনি হলে ইমাম দাসীকে দু’টি ফুলের তোড়া দেওয়া আবশ্যক হতো; অথচ তিনি করেছেন আযাদ। فكر هركس بقدرهمت اوست ‘প্রত্যেকের চিন্তা-ভাবনা তার হিম্মতানুপাতিকই’। কোথায় ইমাম হুসাইন (রা.)’র চিন্তা-চেতনা আর কোথায় গোঁড়া মোল্লার ধারণা! বস্তুতঃ মুরীদের সিজদাহ-এ তাহিয়্যাহ বা অভিবাদন প্রণতির জবাবে পীর তাকে উত্তম প্রত্যুত্তর দেন; তা হল ফয়যে রব্বানী। এ উত্তম অভিবাদন তারা দেখবে কী করে? তারাতো দেখেছে পীরকে পুস্পমাল্য দিতে এসে গলা ধাক্কা খেতে। কতই উত্তম অভিবাদন! তাইনা!

কবিতার বিনিময় : এক কবি দু’টি কবিতা লিখে ইমাম হুসাইন (রা.)’র খেদমতে প্রেরণ করলেন। ক্ষণিক পর আরো দু’টি কবিতা লিখে পৌঁছালেন, যাতে আহলে বায়তের দানশীলতা ও নিজের অভাবের কথা প্রকাশ করলেন। ইমাম হুসাইন (রা.) দশ হাজার দিরহাম দিয়ে বললেন, যদি তুমি তাড়াহুড়া না করতে তবে আমি আরো অধিক পরিমাণ দিতাম। (শহীদ ইবনে শহীদ ১ম খণ্ড ৪৭ পৃষ্ঠা)

ইমাম হাসান (রা.)’র শাহাদতের পূর্বাভাস : ইমাম হাসান (রা.) স্বপ্নে দেখলেন যে, তার দু’চোখের মাঝখানে قل هو الله احد (সূরা ইখলাস ১নং আয়াত) লেখিত আছে। এ ব্যাপারে তিনি তাঁর পরিবার-পরিজনকে সুসংবাদ দিলেন। তাঁরা সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবকে স্বপ্নবৃত্তান্ত জানালে তিনি বলেন, যদি ইমাম সত্যিই এ স্বপ্ন দেখে থাকেন, তবে তাঁর হায়াত খুব কমই বাকী আছে। অতঃপর তিনি কিছুদিন পরই শাহাদত বরণ করেন। (তারীখুল খোলাফা ১৫৩ পৃষ্ঠা)

শাহাদত : শত্রুরা কৌশলে তাঁকে বিষপান করায়। ইমাম হুসাইন (রা.)’র পীড়াপীড়িতেও তিনি কারো নাম বলেননি। তিনি ৫ রবিউল আওয়াল মতান্তরে ৪৯, ৫০, ৫১ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। (তারীখুল খোলাফা ১৫২ পৃষ্ঠা)

অন্তিম অসিয়ত বাস্তবায়নে মারওয়ানের বাধা : অন্তিম মুহূর্তে তিনি হুসাইন (রা.) কে বলেন, ইতোপূর্বে আমি আয়েশা (রা.) থেকে রাসূলুল্লাহ (দ.)’র সাথে সমাধিস্থ হওয়ার অনুমতি প্রর্থনা করেছিলাম। তিনি সম্মতি দিয়েছেন। আমি মারা গেলে তার নিকট তুমি তা তলব করবে। সম্ভবতঃ লোকেরা তোমাকে বাধা দিবে। যদি তারা তা-ই করে তবে তাদের সাথে ঝগড়া করোনা। তিনি শাহাদত বরণ করলে ইমাম হুসাইন (রা.) উম্মুল মু’মেনীন আয়েশা (রা.)’র নিকট এলে তিনি বলেন, হ্যাঁ! সসম্মানে দাফন করা হোক। পরন্তু মারওয়ান তাতে বাধা সাধল। অতএব হুসাইন ও তাঁর সঙ্গীরা রণসজ্জায় সজ্জিত হন। হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) ইমাম হাসান (রা.)’র অসিয়ত স্মরণ করিয়ে দিয়ে নিবৃত্ত করলেন। অতঃপর ইসলামী বিশ্বের পঞ্চম ও শেষ খলিফা, গুপ্ত শহীদ, নবী (দ.)’র ফুল, নবী (দ.)’র দৌহিত্র, নবী (দ.)’র আদর-ভালবাসার হাসান জন্নতুল বক্বী‘ঈতে আম্মাজানের পার্শ্বে সমাধিস্থ হন। [প্রাগুক্ত ১৫৩-১৫৪]

ইতিহাসের পরিক্রমণ বড়ই নিষ্ঠুর! রাসূলুল্লাহ (দ.)’র কাঁধ মোবারকে চড়ে যিনি বেড়াতেন, মিম্বর থেকে ওঠে নবী (দ.) যাঁকে কোলে নিতেন, যার মাথা শুঁকে ঘ্রাণ নিতেন, যাকে সৈয়্যদ আখ্যায়িত করেছেন, যিনি মুসলিমদের জীবন রক্ষায় ক্ষমতার মুকুট বিসর্জন দিয়ে কূফা ত্যাগ করে মদীনায় প্রত্যাগমন করেন, যিনি কামলিওয়ালা নবীর কম্বলের নীচে স্থানপ্রাপ্ত পাঁচজনের অন্যতম, যিনি নবী (দ.)’র ওই নিকটাত্মীয়ের একজন-যাদের ভালবাসা কুরআনের দাবী; ওই মহান ইমামের পবিত্র লাশ নানাজানের পার্শ্বে দাফন করতে দিলনা! নানাজানের কোলে ফিরে যেতে দিলনা! শহীদগণের চিরস্থায়ী জীবনের স্বাক্ষ্য দেয় আল্ কুরআন। দাফনের পরে যখন-তখন নানাজানের কাছে যেতে তাকে কে বাধা দেবে? কোন গভর্নরের সে সাধ্য আছে?
‘কার আছে সাধ্য দূরে সরিয়ে রাখেন তাঁরে?
স্বয়ং মুস্তফা দৌঁড়ে এসে আদরে জড়িয়ে নেন যারে।’

ইমাম হুসাইন (রা.)’র শাহাদতের পূর্বাভাস :
জিগর গূশায়ে মুস্তফা, নূরে নিগাহে মুরত্বাদা, আমীনে আমানতে খোদা, নইয়রে বুরজে সফা, জলওয়ায়ে শমসিদ্দ্বুহা, নকশায়ে বদরিদ্দুজা, পায়করে সবরো রিদ্বা, শাহযাদায়ে কাওনাইন, জনাবে যাহরা কে নূরে আইন, হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)’র শাহাদত আকষ্মিক কোন ঘটনা নয়। শাহাদতে হুসাইন আল্লাহর ইচ্ছায় নির্মিত পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন। শাহাদতে হুসাইন ওই মহান শাহাদত, যার স্বাক্ষ্য রাসূলুল্লাহ (দ.) দিয়েছেন। শাহাদতে হুসাইন ওই পবিত্র শাহাদত, যার স্বাক্ষ্য জিব্রাঈল (আ.) দিয়েছেন, যার নক্সা রাসূলে করীম (দ.) বর্ণনা করেছেন। ইমামে আ’লী মকামের শাহাদত ওই সম্মানিত শাহাদত, যার ঘোষণা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দিয়েছেন। এটি ওই মহান শাহাদত, যার চর্চা পূর্বধারাবাহিকতায় ইমামের জন্মের সাথে সাথে পুরোদমে চর্চিত হতে থাকে। হাদীসের ভাষায়- عن ام الفضل بنت الحارث انها دخلت على رسول الله صلى الله عليه وسلم فقالت يارسول الله انى رايت حلما منكرا الليلة قال ما هو قالت انه شديد قال وماهو قالت رايت كانّ قطعة من جسدك قطعت ووضعت فى حجرى فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم رايت خيرا تلد فاطمة ان شاءالله غلاما يكون فى حجرك فولدت فاطمة الحسين فكان فى حجرى كما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم فدخلت يوما على رسول الله صلى الله عليه وسلم فوضعته فى حجره ثم كانت منى التفاته فاذاعينا رسول الله صلى الله عليه وسلم تهريقان الدموع قالت فقلت يانبى الله بابى انت وامى مالك قال اتانى جبرائيل عليه السلام فاخبرنى ان امتى ستقتل ابنى هذا فقلت هذا قال نعم واتانى بتربة من تربته حمراء
‘উম্মুল মু’মেনীন মায়মুনা (রা.)’র বোন, হযরত আব্বাস (রা.) স্ত্রী, উম্মুল ফদ্বল লুবাবাহ বিনতে হারিস হতে বর্ণিত, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (দ.)’র নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আজ রাত একটি খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। নবী করীম (দ.) জিজ্ঞাসা করলেন, কী স্বপ্ন তুমি দেখেছো ? তিনি বললেন, তা বড়ই কঠিন। নবী (দ.) ফের জিজ্ঞাসা করলেন, তা কী? তিনি বললেন, আমি দেখলাম যে, আপনার শরীর মুবারক হতে একটি টুকরো যেন কর্তিত হয়ে আমার কোলে এসে পড়ল। অতঃপর রাসূলে খোদা (দ.) বললেন তুমি ভালই দেখেছ, ইনশা আল্লাহ ফাতেমার পুত্র সন্তান জন্ম নেবে তাকে (প্রথমে) তোমার কোলে দেওয়া হবে। অতঃপর ফাতেমা হুসাইনকে প্রসব করলেন এবং তাঁকে আমার কোলেই দেওয়া হয়েছে; ঠিক নবী করীম (দ.) যেমনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। অতঃপর একদা আমি (উম্মুল ফদ্বল) তাঁকে [হুসাইনকে] এনে নবী (দ.)’র কোলে দিলাম। তারপর লক্ষ্য করলাম নবীজির দু’চোখ হঠাৎ অশ্রু বর্ষণ করছে। আমি আরয করলাম, আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর উৎসর্গ! আপনার কী হয়েছে? প্রত্যুত্তরে নবী (দ.) বললেন, জিব্রাঈল (আ.) এখনই আমার নিকট এসে সংবাদ দিয়ে গেল যে, আমার উম্মত অচিরেই আমার এ বেটাকে হত্যা করবে। আমি (বর্ণনাকারী) বললাম, এ বেটাকে! নবী (দ.) বললেন, হ্যাঁ। জিব্রাঈল ওই স্থানের কিছু লাল মাটিও আমাকে দিয়ে গিয়েছে’। (মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৭২ পৃষ্ঠা)।

শহীদে আ’যমের শাহাদত : মদীনার প্রশাসকের মাধ্যমে ইয়াযিদ হযরত ইমাম (রা.)’র বায়‘আত তলব করলে তিনি যৌক্তিক কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেন। মদীনা মুনাওয়ারার প্রশাসক ইয়াযিদের ফরমান পড়ে শুনালে ইমাম মদীনার পবিত্র ভূমিতে রক্তপাত এড়িয়ে যাওয়ার জন্য মক্কায় হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। প্রস্তুতির সংবাদ পেয়ে ক্ষণিকের মধ্যে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল গৃহের আঙ্গিনা। সবাই কাতর আবেদন-নিবেদন জানালেন, মদিনা ছেড়ে না যেতে। ইমাম সকলকে সান্ত্বনা দিয়ে আহলে বায়াতকে দ্রুত প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আম্মাজানের মাযারে উপস্থিত হয়ে বিদায়ী সালাম নিবেদন করলেন। এ বিদায়ের ক্ষণ কতই বেদনার-কতই দুঃখের, বর্ণিবার সাধ্য নাই। তা অন্তরে অনুভব করা যায় কিন্তু প্রকাশের ভাষা নাই। রাত্রি তৃতীয় প্রহরে নানাজানের রওযায় হাযির হলেন। পরিস্থিতির বর্ণনা দিলেন। রাত্রি শেষ প্রহরে তন্দ্রায় কারবালা দৃশ্যপট স্বপ্নে দেখলেন। নানাজান বুকে জড়িয়ে চুমু খেয়ে ধৈর্যের দীক্ষা দিয়ে বিদায় জানালেন। জেগে নানাজানের রওযা চুমে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর অসুস্থ ফাতেমা-এ সুগরাকে মদীনায় রেখে মক্কার পথে যাত্রা দিলেন।
৪ শা’বান ৬০ হিজরী সূর্য উদয়ের পূর্বে রাত্রি আঁধারে হুসাইন (রা.) আহলে বায়তদের নিয়ে মক্কার পথে চললেন। মক্কায় পৌঁছার পর কূফাবাসীদের পত্র ইমামের নিকট আসতে শুরু করল। কূফার রঈসদের পত্র, নাগরিকদের পত্র, আমীরদের পত্র, ওলামাদের পত্র, সর্বসাধারণের পত্র; প্রায় দেড়শ পত্র পাওয়ার পর ইমাম (রা.) অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য ইমাম মুসলিম (রা.) কে প্রেরণ করলেন। ইমাম মুসলিম কূফায় পৌঁছলে দলে-দলে লোকেরা এসে তাঁকে স্বাগতম জানাল। প্রথম দিনেই ইমাম হুসাইন (রা.)’র অনুকূলে মুসলিমের হাতে বার হাজার কূফাবাসী বায়াত নিল। তাদের আবেগ-উচ্ছ্বাস দেখে তিনি ইমামের বরাবরে চিঠি পৌঁছালেন। অবস্থা বেগতিক দেখে ইয়াযিদ নো’মান বিন বশীরকে কূফার গভর্নর পদ হতে বহিস্কার করে ইবনে যিয়াদকে নিয়োগ দিল। ইবনে যিয়াদ পর্দাবৃত মুখে হিজাযের পথে কূফায় আগমন করে কৌশলে অবস্থা ইয়াযিদের অনুকূলে নিয়ে এল এবং ইমাম মুসলিমকে শহীদ করে দিল। মুসলিম শহীদ হওয়ার কারণে অবস্থার অবনতির বিষয় ইমামকে জানাতে পারলেননা।
ইমাম মুসলিম পহেলা যিলহজ্ব চিঠি প্রেরণ করেন আর ৮ যিলহজ্ব ইমাম হুসাইন চিঠি পান। ৮ যিলহজ্ব হাজ্বীগণ মীনার পথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে আর ইমাম কারবালার পথে। পথিমধ্যে ইমাম মুসলিম ও তাঁর দুই শাহযাদার শাহাদতের সংবাদ পেলেন। বহু ঘটনাপ্রবাহের পর ইমামের কাফেলা কারবালায় স্বপ্নদর্শিত স্থানে তাবু ফেললেন। এটি সে যায়গা, যেখানে নূহ (আ.)’র কিস্তি ডুবু-ডুবু করেছিল। এটি সে স্থান, যার লাল মাটি জিব্রাঈল মুহাম্মদ (দ.) কে প্রদান করেছিলেন; যা উম্মুল মু’মেনীন উম্মে সালমা (রা.)’র নিকট শিশিতে সংরক্ষিত আছে, মুস্তফা (দ.)’র ভবিষ্যদ্বাণী মতে অছিরেই তা রক্তে রূপান্তরিত হবে। এটি সে স্থান, কোন যুদ্ধে যাওয়ার কালে যেখানে দাঁড়িয়ে মাওলা আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। ৬১ হিজরীর ২ মুহাররম কারবালার ফোরাত প্রান্তরে ছায়াবিহীন আকাশের নীচে তাবুতে অবস্থান নেন। ৭ মহররম ইয়াযিদী বাহিনী পানি বন্ধ করে দেয়। তিন দিন ধরে সবাই ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত। দুগ্ধপোষ্য আলী আসগর পানির জন্য ছটফট করছে, অসুস্থ যয়নুল আবেদীন কাতরাচ্ছে। ১০ মুহাররমের পূর্বরাত ইমাম সকল সঙ্গীকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ইমামকে একা ফেলে যেতে কেউ সম্মত হলনা। অবশেষে ১০ মহাররম সকাল থেকে যুদ্ধ শুরু হয়। বদরে শত্রু সৈন্য ছিল তিনগুণ আর কারবালায় তিনশ গুণ। যুদ্ধরীতি মেনে মোকাবিলা করলে হুসাইনী ফৌজের সামনে তারাও হয়তো ঠিকতে পারতনা। যখনই একজন-একজন করে মোকাবিলায় একজন হুসাইনী সৈন্য বহুজনকে কতল করতে দেখেই তারা যুদ্ধনীতি ভঙ্গ করে বহুজন ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ ভাবে ইয়াযিদী বহিনী বারবার যুদ্ধনীতি ভাঙ্গে। একে-একে সকল বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বেরাদর, আত্মীয়-স্বজন শহীদ হয়ে গেলেন। দুগ্ধপোষ্য আলী আসগরও শাহাদাতের পেয়ালা পান করলেন। অসুস্থ যয়নুল আবেদীন ও ইমাম ছাড়া আর কেউ রইলনা। সকাল থেকে শহীদের লাশ বইতে-বইতে কাহিল ইমাম। কুরবান ওই ইমামের দৃঢ়তা-বীরত্বের ওপর, যিনি নিজ পুত্র, ভ্রাতুস্পুত্র, ভাগ্নে, ভাই, চাচাত ভাই ও বন্ধু-বান্ধবদের একে-একে শহীদ হতে দেখেও অবিচল। হুসাইন ভিন্ন অন্য কেউ হলে যুদ্ধতো নয় শত্রু সংখ্যা দেখেই মারা যেতো। শীমার ডাক দিল, হুসাইন এগিয়ে এসো। সকলকে ধৈর্যের দীক্ষা দিয়ে বিদায় নিয়ে শেরে খোদার শের এগিয়ে যেতেই অসুস্থ যয়নুল আবেদীন ওঠে অনুমতি চাইলেন। কিন্তু জ্বরের প্রকোপে পড়ে গেলেন। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে যিবহে আযিমের বাস্তব নমুনা, ইমামে আলী মকাম এগিয়ে গেলেন।
ইয়াযিদী ফৌজের ধারণা হুসাইনের মাঝে লড়ার টুকু শক্তিও থাকবেনা। তিন দিনের ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত, সকাল থেকে চোখের সামনে পুরো খান্দান উজাড় হল, লাশ ওঠাতে-ওঠাতে কোমর টুটে পড়েছে; এখন আর কি মোকাবিলা করবে? তাদের এক সৈন্য ইবনে সিনান এগিয়ে আক্রমণ করল। তিনি আক্রমণ ব্যর্থ করে একটি আঘাতেই তাকে জাহান্নামে পৌঁছে দিলেন। আমর সাধারণ হামলার নির্দেশ দিল। যুদ্ধরীতি ভেঙ্গে চতুর্দিক হতে একটিমাত্র নিশানার প্রতি তীর-তরবারী-বর্শা-বল্লম বর্ষণ শুরু হল। পরন্তু ইবনে হায়দরের তরবারী হায়দরী মহত্বে চলতে রইল আর ইয়াযিদী সৈন্য মরতে থাকল। এক পর্যায়ে ইমাম ফোরাতও আয়ত্ত্ব করলেন কিন্তু পানি পান করলেননা। বস্তুতঃ পানি পানের ইচ্ছাও ছিলনা। শুধু দুনিয়াবাসীকে এটাই দেখিয়েছেন যে, হুসাইন চাইলে ফোরাতও জয় করতে পারে আবার কাওসার-সলসবীলও কারবালায় বইয়ে দিতে পারে। পরন্তু আল্লাহর ইচ্ছানুসারেই হুসাইন ক্ষুধার্ত-পিপাসার্তই শহীদ হবেন।
অবশেষে আঘাত জর্জরিত হুসাইন (রা.)’র মুখ বেয়ে রক্ত বেরুতে রইল। এমতাবস্থায় মালাউন যর‘আহ বিন শরীক ইমামের বামবাহুতে তলোয়ার চালাল আর বাম হাত কেটে লটকে পড়ল। ডান হাতে তরবারী ধরা ছিল, মরদূদ সিনান বিন আনাস বক্ষে বর্শাঘাত করল আর বর্শা বক্ষভেদ করে গেল। আল্লাহর মিলনের মুহূর্ত ঘনিয়ে এল। সিনান বর্শা টান দিলে ইমাম ঘোড়া হতে পড়ে গেলেন। ফাতেমার লাল রক্তে ডুবে গেল আর ইসলামের ডুবন্ত তরী তীরে পৌঁছল। ইমাম হুসাইন (রা.) রক্তের লালবৃত্ত সত্য ও মিথ্যার সীমা নির্ধারণ করে দিল।
সবাক কুরআন পড়া মাত্রই শিমার ঘাড়ে পা রাখল আর সিনান হট্টগোল করে শিরোচ্ছেদ করতে বলল। ইমাম আলী মকাম নামাযে ইশ্ক আদায়ের জন্য ওল্টিতে চেষ্টা করলেন, শেষ শক্তি শেষ সিজদার জন্য ব্যয় করছেন। শিমারকে পা ওঠাতে বললেন যেন শেষ সিজদা আদায় করতে পারে। কিন্তু যালেম শিমার ইমামের শেষ অনুরোধও রক্ষা করলনা। অবশেষে ইয়াদুল্লাহর শক্তিতে হুসাইন পার্শ্ব ফিরে আবেদনের মস্তক আল্লাহর দরবারে রাখলেন।
اسلام كى دامن مين بس اس كى سوا كياهى
اك ضرب يداللهى‘ اك سجده شبيرى-
এ সিজদা-এ নিয়াযই মানুষকে كرمنا بنى ادم এর মুকুট পরিয়ে ফিরিশতা অপেক্ষা আশরফ ও সর্বসৃষ্টির সেরা করেছেন। শিমার খঞ্জর চালাচ্ছে আর প্রেমের সত্তম সিজদা আদায় হচ্ছে, সারিবদ্ধ ফিরিশতা শাহানশাহে কারবালাকে সালামী পেশ করছেন। অতঃপর সিনান বিন আনাস ওই পবিত্র মস্তক দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করল, যাকে রাসূলুল্লাহ (দ.) চুমু খেতেন। ফাতেমার লাল সকল পরীক্ষায় পরিপূর্ণ উত্তীর্ণ হয়ে আল্লাহর দরবারে পৌঁছে গেলেন।
وصلى الله تعالى على جدّه الكريم وعليه واصحابه وانصاره وابنائه واخوانه وازواجه واهل بيته وعترته وبناته واحبابه اجمعين-