লেখক: কাযী মাওলানা এ টি এম শরফুদ্দীন হারূনী

[“মুক্তিধারা” ৪র্থ বর্ষ ১ম সংখ্যা ২০১৪ হতে]

 

সিরাতে মুস্তাকীম বা সরল সঠিক পন্থা চিনুক বা নাইবা চিনুক মুসলমান মাত্রই এ পথে পরিচালনার সকাতর নিবেদন জানায় আল্লাহর দরবারে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্তের ফরয নামাযে সতের বার, সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ’য় ১২ বার, যায়িদাহ’য় আট বার এবং বিতরের ওয়াজিবে তিনবার সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করা হয়। এ সুবাদে ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ কথাটি ন্যূনতম দৈনিক বিশ বার উচ্চারণ করেনা এমন মুসলিমের সংখ্যা খুবই কম। সুতরাং কোন পুস্তকের নাম যদি সিরাতে মুস্তাকীম হয়, তদপ্রতি আকর্ষণ হওয়াই স্বাভাবিক। কৌতুহলোদ্দীপক নামটির কারণেই সিরাতে মুস্তাকীম নামক পুস্তকটি কেনা ও পড়া দু’টোই সারা হয়েছে ছাত্র জীবনে। নামের সাথে কামের গরমিল, সঠিক পথের নামে বক্রতার চোরাগলি সব দেখে-শুনে সহজ-সরল মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে আশঙ্কায় শঙ্কিত হই।
ঈমান বিধ্বংসী সরল নামের গরলে আজ যখন একান্ত কাছের মানুষও অজ্ঞাতে বিধ্বস্ত হচ্ছে, তখন বিবেকের তাড়নায় কলম হাতে তুলে নিই। বিষ যাদের সর্বাঙ্গে ছেয়ে গিয়েছে, জানি তাদের বিষ নামাতে পারবোনা; কারণ আমি ওঝা (পরিপক্ক লেখিয়ে) নয়। বক্রতার চোরাগলিতে যারা হারিয়ে গিয়েছে, তাদের  সরলতার রাজপথে আনাও আমার কর্ম নয়। see পরন্তু যারা সর্পমুখে পড়ি-পড়ি করছে কিংবা বক্রতার গলি ছুঁই ছুঁই, তাদের জন্য সতর্ক সংকেত স্বরূপ এ প্রবন্ধের অবতারণা। তথ্য ও ভাষাগত দুর্বলতা ঘুচাতে বিজ্ঞ সম্পাদকের সম্পাদনার কাঁচি সচল হলে কৃতজ্ঞ হবো।
প্রিয় পাঠক! আপনাদের বিবেকাদালতে ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ গ্রন্থের মাত্র কয়েকটি উদ্ধৃতি পেশ করা হল।
ক. ‘চুঁ হুব্বে ঈমানী বকামালে খূদ মীরছদ, আঁ শখসরা দর কশফে খূদ গেরেপ্তাঃ ওয়া যেরে ছায়ায়ে কেফালতে খুদ আওয়ারদাঃ জারেহায়ে তদবীরে তাকবীনি ওয়া তাশরীয়ি খূদ সাযদ। আয়দ্বান ফীহি মিন বজাহ মকাল্লিদে আম্বিয়া মীবাশদ ওয়া মিন বজাহ মুহাক্কিক দর শরাঈ। আগর যকীউল আকল আস্ত নূরে জিবিল্লীয়ে ঊ বসূয়ে কুল্লিয়াতে হক্কুহু মুনাআকেদাঃ দর খযীরাতিল কুদস কেঃ বরায়ে তরবীয়তে নূরে ইনসানী উমূমান তায়িন গরদিদা ঊরা রাহনুমায়ী মী ফরমায়ন্দ। ওয়া আঁ কুল্লিয়াত দর যেহনে ঊ আলা মুরুরিদ্দুহুর ওয়াল আ’সার মাহফূজ মীমানদ ওয়া ইসতিম্বাতে জুযিয়াত আয আঁ কুল্লিয়াত মীকুনদ। পস উলূমে শরীয়াঃ বদূ ওয়াসেতা মীরছদ। বওয়াসেতায়ে নূরে জিবিল্লী ওয়া বওয়াসেতায়ে আম্বিয়া। পস দর হুকমে আহকামে মিল্লাত ও কুল্লিয়াতে শরীয়ত ঊরা শাগরিদে মী তাওয়াঁ গুপ্ত ওয়াহাম উস্তাদে আম্বিয়া। ওয়া হাম তরীকে আখয শূবাঃইস্ত আয শূ’আবে অহী কেঃ আঁরা দর উরফে শরআ ‘নফসুন ফিররূহ’ তা’বীর মীফরমায়ন্দ ওয়া বা’যে আহলে কামাল আঁরা অহীয়ে বাতেনী মীনামন্দ। পস ফরক মা বাইনে ইঁ কেরাম ওয়া আম্বিয়ায়ে ‘এজাম বইকামতে আশবাহ ওয়া ফতানে হুকম ওয়া মাবউসিয়ত ইলাল উমাম আস্ত। বস নিসবতে ইঁশাঁ বা আম্বিয়া মিসলে নিসবতে ইখওয়ানে সেগার বা ইখওয়ানে কিবার ইয়া নিসবতে আবনিয়ায়ে কিবার বা আবায়ে খূদ আস্ত।’
‘যখন ঈমানী ভালবাসা স্বীয় পূর্ণতায় পৌঁছে। এ ধরণের ব্যক্তিকে স্বীয় কাশফ বা উম্মুক্তকরণের মধ্যে আবেষ্টিত এবং নিজের যিম্মাদারীর ছায়ায় আনীত আপন সম্পাদন ও প্রণয়ন ব্যবস্থার কারখানা বানান। তারা একদিক থেকে নবীদের অনুসারী আবার অপরদিক থেকে শরীয়তে মুহাক্কিক। এমন লোকেরা যদি তীক্ষ্ম মেধাসম্পন্ন হয় তবে তার নূরে জিবিল্লী বা সত্ত্বাগত আলো ঐ কুল্লিয়াতে হক বা সামগ্রীক সত্যের পথ দেখায় যা হাযীরাতুল কুদস বা ‘পবিত্র আলয়ে’ সাধারণতঃ মানুষের দীক্ষার জন্য নির্ধারিত। ঐ কুল্লিয়াত বা সমগ্র বোধিতে সর্বদা রক্ষিত থাকে। সে শাখাসমূহের চয়ন ঐ কুল্লিয়াত বা সমগ্র থেকে করে। অতঃপর দ্বীনি জ্ঞানসমূহ তার নিকট দু’টি মাধ্যমে পৌঁছে। সত্ত্বাগত নূর ও নবীগণের মাধ্যমে। সুতরাং শরীয়তের বিধি বিধান ও কুল্লিয়াতে তাকে নবীদের ছাত্রও বলতে পার আবার শিক্ষকও। তার জ্ঞানাহরণ পদ্ধতি অহীর প্রকারসমূহের একটি; যাকে শরীয়তের পরিভাষায় ‘নফস ফিররূহ’ বা আত্মায় ফুঁকে দেওয়া বলা হয়। কতেক বুযুর্গ এটাকে অহীয়ে বাতেনী বা গোপন প্রত্যাদেশ বলে থাকেন। অতঃপর ঐ শ্রেণীর বুযুর্গ ও নবীদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে তারা হুকুম প্রতিষ্ঠা করে আর নবীগণ উম্মতের প্রতি প্রেরিত হন। সুতরাং তাদের ও নবীদের মাঝে সম্পর্ক হচ্ছে ছোটভাই বড় ভাইয়ের মত অথবা বড়পুত্রের সম্পর্ক যেমন নিজ পিতার সাথে’। (সিরাতে মুস্তাকীমের উদ্ধৃতিতে সাইফুল জব্বার ৫০ পৃঃ, সিরাতে মুস্তাকীম মুতারজম উর্দু ৫৪-৫৯ নং পৃষ্ঠা, দারুল কিতাব দেওবন্দ, ইউপি)
খ. ‘সূফীবেশী মুশরিকদের বিদআত থেকে একটি হচ্ছে পীর মুর্শিদের সম্মানে এতটুকু সীমালঙ্ঘন করা, যাতে পীরকে নবী ও খোদার সমকক্ষ করার আক্বিদা প্রকাশ পায়। যা এ যুগের সকল মানুষ বিশেষ করে হিন্দুস্থানে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। আল্লাহর কতেক মকবুল বা গৃহীত বান্দাও এতে ফেঁসে গিয়েছে।’ (সিরাতে মুস্তাকীম উর্দু মতারজম, ৮৫ পৃষ্ঠা, দারুল কিতাব দেওবন্দ)।
গ. “আহলুল্লাহ কী কবরোঁ পর নাজায়েয বিদ্আতোঁ কা ইয্হার সূফী শাআর মুশরিকোঁ কী উন বিদ্আত সে হয়; জূ ইস মুলক কে লোগোঁ কী নজর মে নেক কাম কে লেবাস মে যাহের হুতী হয়ঁ। আগরচেঃ ওয়ে বিদআতীঁ বেশুমার হয়ঁ লেকীন দূ-তিন কবীহ আমর মিসাল কে তূরপর ইস্ মকাম মে যিকর কিয়ে জাতে হয়ঁ, তাকেঃ দূসেরে কবীহ কামোঁ কো বিহী উমূরে মযকূরাহ পর কিয়াস করসেকী। দূর দূর কে মুলকোঁ সে সফর কী বডী বডী মুসিবতীঁ উঠা কর আওর রাত দিন কী তকলীফিঁ আওর দূখ ঝেলকর আউলিয়াল্লাহ কে কবরোঁ কী যিয়ারত কে ওয়াস্তে আনা উনহী বিদ্আত মে সে হয়। আওর উন সফরোঁ মে আগরচেঃ তকলীফিঁ উঠাতে হয়ঁ, আওর ইয়ে সফর উনকো শিরক কে যুলমাত আওর আল্লাহ কে গযব কী ওয়াদী মে পহচাতে হয়ঁ।”
অর্থাৎ: আল্লাহওয়ালাদের কবরে অবৈধ বিদ্আতের প্রকাশ সূফীবেশী মুশরিকদের ঐ সকল বিদ্আতের অন্তর্ভুক্ত; যা এ দেশের মানুষদের দৃষ্টিতে সৎকাজের ছদ্মাবরণে প্রকাশিত। যদিও ঐ সকল বিদ্আদ অগণিত কিন্তু দু-তিনটি মন্দকাজ উদাহরণ স্বরূপ এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে, যাতে অন্যান্য মন্দাকাজসমূহও উল্লেখিত কাজের ওপর অনুমান করা চলে। দূর-দূরান্তের দেশসমূহ হতে সফরের কঠিন কষ্ট রাত দিনের ক্লান্তি ও দুঃখ সহ্য করে অলিআল্লাহদের কবর যিয়ারতের জন্য আসা; ঐ সকল বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। ঐ সকল সফরে যদিও দুঃখ কষ্ট ভোগ করে তথাপিও এ সফর তাদেরকে শিরকের অন্ধকার ও আল্লাহর অভিশাপের উদ্যানে পৌঁছিয়ে দেয়। (সিরাতে মুস্তাকীম মুতারজম উর্দু ৮৭ পৃঃ)
উক্ত উদ্ধৃতি ক’টি ঈমানের জ্যোতিযোগে দেখুন। গভীর মনোযোগে পড়ুন। আকলে সলীম বা সুস্থ বিবেকে বিবেচনা করুন। নবী করীম রউফুর রহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র প্রেম নিয়ে নিজেকে নিজে জেরা করুন। অতঃপর নির্ভুল-নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিন এবং তা ক্বলবে সলীম বা সুস্থ অন্তরে স্থান দিয়ে মুতমায়িন বা প্রশান্তচিত্ত-নিশ্চিন্ত- আস্থাশীল হোন; যাতে প্রবক্তা ও অনুলিখকের নাম দেখে স্বজনপ্রীতি কিংবা প্রতাপভীতির স্বীকার না হন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র প্রেম-প্রীতির বিপরীতে অন্যান্য সকল কিছুর ভালবাসা গৌণ না হলে কঠিন শাস্তি ও হিদায়ত না দেওয়ার ঘোষণা আল্লাহর কালাম মর্মে প্রতিভাত। ইরশাদ হচ্ছে, ‘বলুন, যদি তোমাদের পিতা, পুত্রগণ, ভাইগণ, পত্মীগণ, স্বজাতি, অর্জিত সম্পদ, তোমাদের সে ব্যবসা-বাণিজ্য, যার ক্ষতির আশঙ্কা করো, সে সুরম্য বাসস্থান, যা পছন্দ করো; এ সব তোমাদের নিকট আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ অপেক্ষা প্রিয়তর হয়, তবে আল্লাহ তাঁর নির্দেশ (শাস্তি) আনার প্রহর গুণো; এবং আল্লাহ ফাসিকদের হিদায়ত প্রদান করেন না’। (সূরা তাওবা ২৪ নং আয়াত) প্রভাব-প্রতাপ ভীতির ক্ষেত্রে আল্লাহই ভীতি যোগ্য। ইরশাদ হচ্ছে, ‘কিন্তু তাদের মধ্যস্থ যারা অবিচার (গোঁড়ামীর ভিত্তিতে অহেতুক আপত্তি) করে, তবে তাদেরকে ভয় করোনা এবং আমাকেই ভয় করো’। (সূরা বাকারা ১৫০ নং আয়াত)
‘সিরাতে মুস্তাকীম’ প্রণেতা কে? এ বিষয়ে স্বয়ং ইসমাঈল দেহলভীর নিম্মোক্ত বক্তব্য পড়ুন। “আ’জেযে যলীল খোদাবন্দে জলীল কী রহমত কা উম্মীদওয়ার বন্দায়ে যয়ীফ মুহাম্মদ ইসমাঈল আরয করতা হয়, কে: ইস্ কমতরীন পর খোদা তা‘আলা কী বেশুমার নেয়ামতীঁ হয়ঁ। আওর সব সে বড়ী নে‘য়ামত হাদীয়ে যমানা: মুর্শিদে য়গানা: হযরত সৈয়্যদ আহমদ ছাহেব কী মাহফিলে হেদায়ত মন্যিল মেঁ হাযের হুনা হয়। আল্লাহ তা‘আলা তামাম মুসলমানোঁ কো আপকে দের তক যিন্দা রাখ্নে সে ফায়েদা দে। আওর আপকে আক্বওয়াল ওয়া আফ্‘আল আওর অহ্ওয়াল কে সাথ্ সব তালেবানে কুরবে এলাহী কো নফ‘আ পহুচায়ে আওর চূকে: ইয়ে আজেয উস্ মজলিসে আলী মে হাযের হুনেকে ওয়াক্ত কলিমাতে হেদায়ত আয়াত কে সুন্নে সে কামিয়াব হুয়া তূ আম মুসলমানোঁ কী নসিহত আওর তালেবানে কুরবে এলাহী কী খায়রখাহী কা ইয়ে তাকাযা হু কে: গায়েবীন বিহী উন ফয়ূযে এলাহীয়া মে হাযেরীন কে সাথ্ শরীক হুঁ আওর উসকা ত্বরীক বজুয ইস্কে আওর কূঈ নেহী কে: উন বুলন্দ পরওয়ায মাযামীন কো তাহরীর কে পিঞ্জর মে কয়দ্ কর দিয়া জায়ে।”
অর্থাৎ- “অধম সহায়হীন মহান খোদার দয়া প্রত্যাশী দুর্বল বান্দা মুহাম্মদ ইসমাঈলের নিবেদন, এ হীনের উপর আল্লাহ তা‘আলার বেশুমার রহমত রয়েছে, সর্বাপেক্ষা বড় নে’য়ামত হাদীয়ে যমনা মুর্শিদে য়গনা হযরত সৈয়্যদ আহমদ সাহেবের হেদায়ত সভায় উপস্থিতি। আল্লাহ তাকে দীর্ঘজীবি করে সকল মুসলমানদের উপকৃত করুক। এবং তার কথা, কর্ম ও অবস্থার সাথে সকল প্রভু নৈকট্য অন্বেষীকে সৌভাগ্য মণ্ডিত করুক। যেহেতু এ অসহায় ঐ মহান সভায় উপস্থিত হয়ে হেদায়তপূর্ণ উপদেশ শুনার সৌভাগ্য লাভ করেছি, সেহেতু সাধারণ মুসলমানদের নসিহত ও খোদা-নৈকট্য অন্বেষীর মঙ্গল কামনার এ দাবী দেখা দিল যে, অনুপস্থিত লোকেরাও ঐ সকল ফুয়ূজে এলাহীয়ায় উপস্থিতির সাথে অংশীদার হোক। সুতরাং এ উচ্চাঙ্গের বিষয়াবলী লেখনীর ফ্রেমে বেঁধে দেয়া ছাড়া এর অন্য কোন গত্যান্তর ছিলনা।” (সিরাতে মুস্তাকীম মতারজম উর্দু ৩-৪ পৃষ্ঠা, দারুল কিতাব দেওবন্দ ইউ. পি থেকে প্রকাশিত।)
“ইস্ আজেয নে কিতাব কে হর দূ হিসসা কো ইমলাকে বা‘দ হযরত সৈয়্যদ সাহেব কে গোশগুজার কর দিয়া, তাকে: মকসূদ গায়রে মকসূদ সে মমতায হুজায়ে। আওর জূ নুকসান ইস্ হেচমদাঁ কী মুদাখিলতে আকলকে বা‘ইস ইস্ কিতাব মে আগয়াহু আঁজনাব কী ইসলাহ কী বজাহ উসকা জবরে নুকসান হুজায়ে।”
অর্থাৎ: “এ অধীন পুস্তকের উভয় অংশ অনুলিখনের পর হযরত সৈয়্যদ সাহেবের কর্ণগোচর করে দিলাম। যাতে ঈপ্সিত বিষয় অনাকাংখিত বিষয় থেকে পৃথক হয়ে যায়, সে সাথে এ মূর্খের জ্ঞান-বুদ্ধির প্রবেশ হেতু যে ঘাটতি ঘটেছে তাও যেন মহাত্মনের পরিশুদ্ধিতে পূরণ হয়ে যায়।” (প্রাগুক্ত ৫নং পৃষ্ঠা)
ইসমাঈল দেহলভীকে ওহাবী গুরু বলে, যত দোষ তার উপর ছাপিয়ে; সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীকে নিখুঁত প্রমাণে সচেষ্টরা হয়তো অভিযোগ করতে পারেন, ইসমাঈল দেহলভী পুস্তকটি রচনা করে গ্রহণযোগ্য করার জন্য সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর নামে প্রচার করেছে মাত্র। যেমন: “সিরাতে মুস্তাকীম নামক পুস্তকটির লেখক ওহাবী নেতা ইছমাঈল দেহলভী, সৈয়দ আহমদ বেরলভী (রঃ) নন। ওলামা পরিষদ, মুনিরীয়া তাবলীগ কমিটি, বাংলাদেশ প্রণীত ‘রদ্দে আন-নূর’ ১১৪ পৃষ্টা।
প্রত্যুত্তরে বলা যায়, যদি তা হয় তবে সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী কিংবা তার শীর্ষস্থানীয় খলিফাগণ প্রতিবাদ করেনি কেন? বরং তার সিলসিলার প্রখ্যাত একজন খলিফা মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরী সাহেব ‘যখিরায়ে কেরামত’ নামক পুস্তকের ২৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “আওর সিরাতে মুস্তাকীম কে উস্কে মুসান্নেফ হযরত সৈয়্যদ ছাহেব আওর উস্কে কাতেব মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল মুহাদ্দেস দেহলভী হয়ঁ।” অর্থাৎ “এবং ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ যার প্রণেতা হযরত সৈয়্যদ সাহেব আর অনুলিখক মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল মুহাদ্দেস দেহলভী।”
আরো উল্লেখ্য যে, সিরাতে মুস্তাকীম বেরলভী ঘরনার এমন এক পুস্তক, যা অধ্যয়নের জন্য সুদূর ভারত থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত সফরের কষ্টও সইতে বাঁধেনা জৌনপুরী হুযুরের। “হযরত মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরী (রঃ) সুদূর ভারত থেকে হযরত মাওলানা ইমামুদ্দীন বাঙ্গালী (রঃ)’র কাছে চেরাতে মোস্তাকিম পড়ার জন্য দু’দুবার এসেছিলেন। প্রথমবার আসার বর্ণনায় এরূপ পাওয়া যায়-
‘কেরামত আলী ছাহেব হন যে জনা, বঙ্গ দেশে নাই তাঁর তুলনা ॥
ছেরাত্বাল মোস্তাকিম পড়েছিলেন না, উপযুক্ত ওস্তাদ যখন পাইলেন না ॥
শিক্ষার জন্য ছিলেন বহু পেরেশান, পীরের খোঁজ করিতেছিলেন হিন্দুস্থান ॥
—————————————————————-
গেলেন কাছে ইমামউদ্দীন ছাহেবের, ছিরাত্বাল মোস্তাকিম কিতাব মারফতের ॥
শিক্ষা করিতে তিনি শুনেন ভাই, ১৭ দিন অধ্যয়ন করেন বলে যাই ॥
তৎপরে গেলেন দেশে চলিয়া, বাকী টুকু শিখিলেন পুনঃ আসিয়া’ ॥
দ্বিতীয়বার আসার বর্ণনায় এভাবে লিখা হয়-
‘মাওলানা ছাহেবের নাম কেরামত আলী, পুনঃ আসতেছিলেন যব নোয়াখালী ॥
মারফাত এলেম হাসিল করিতে, ছিরাত্বাল মোস্তাকিম শিখিতে ॥
ইমামুদ্দীন ছাহেব মরহুমের কাছে, নোয়াখালী জিলাতে যিনি আছে ॥’
(“পীরতত্ত্ব” নামক পুস্তিকার উদ্ধৃতিতে হাফেজ মাওলানা নুরুল আবছার প্রণীত ‘আমিরুল মোমেনীন হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ (রঃ) ও প্রাসংগিক বিষয়’ ১১০ পৃষ্ঠা।)
সিরাতে মুস্তাকীমের আপত্তিকর বক্তব্য এবং প্রণেতা ও অনুলিখকের ব্যাপারে সেকাল থেকে এ কালের ওলামায়ে আহলে সুন্নাত কুফর ও কাফির মর্মে রায় দিয়েছেন। দেখুন, আল্লামা ফদ্বলুর রাসূল হানাফী কাদেরী উসমানী বাদায়ূনী রচিত ‘সাইফুল জব্বার’, আল্লামা আহমদ রেযা খান ফাযিলে বেরলভীর ‘ফতওয়া-ই রযবীয়্যাহ’, আল্লামা আযীযুল হক শেরে বাংলা রচিত ‘দিওয়ানে আযীয’, আল্লামা আবেদ শাহ মুজাদ্দেদী রচিত ‘ইসলাহে মশায়িখ’, মাওলানা আব্দুল করীম সিরাজ নগরীর ‘মাহবুবে খোদাকে ভাই বলিল কাহারা’ ও মাওলানা মফজল আহমদ নঈমীর ‘আউযু বি রাব্বিন্নাস মিনাল আস ওয়াসিল খান্নাস’ ইত্যাদি। আমি মুফতী সাহেব নই বিধায় নিজ থেকে কোনরূপ রায় প্রদান করছিনা। পাঠকদের বিবেকাদালতে শুধু প্রশ্ন রাখাছি যে, সিরাতে মুস্তাকীমের উদ্ধৃত অংশ যদি ওহাবীয়্যাতের মোহরযুক্ত হয়, তবে তার প্রণেতা, অনুলিখক, সবকদাতা ও গ্রহীতার ললাট কী করে সে মোহরমুক্ত হবে? মোহরমুক্ত ভেবে নিজের অজ্ঞাতে কেউ কি ওহাবীয়্যাতের তিলক আপন কপালে সেঁটে নিচ্ছেন কি না; ভাবার সময় এখনই।