[আরশাদুল ক্বাদেরী (রহ.)’র লালাঃযার অবলম্বনে]
লেখকঃ প্রমিত মুন্তাসির পান্থ
দ্বিতীয় দিন ইবনে যিয়াদ আহলে বায়তের লুন্ঠিত কাফেলাকে ইবনে সা’দের নেতৃত্বে দামেস্কের দিকে প্রেরণ করল। হযরত ইমামের মস্তক মোবারক বর্শাগ্রে আগে আগে চলছে। পেছনে আহলে বায়তের উট। এমনই অনুভূত হচ্ছিল যে, ইমামে আলী মকাম এখনও আপন হেরমের দেখা-শুনা করছেন।
পথিমধ্যে শির মোবারক হতে অত্যাশ্চর্য অলৌকিকতা ও কারামাত প্রকাশ পাচ্ছিল। রাতের নীরবতায় মাতম ও আহাজারীর আবেগঘন আওয়াজ শূন্যে ভাসতে ছিল, কখনো কখনো শির মোবারকের চতুস্পার্শে নূরের বিকরণ ঠিকরে পড়তে দেখা যচ্ছিল।
যে জনপথ দিয়েই এ কাফেলা যেত, সবখানে শোর উঠত। দামেস্কের শহর দেখা যেতেই ইয়াযিদী সেনাপতি আনন্দে নাঁচতে লাগল। বিজয়ের সংবাদ শুনানোর জন্য প্রত্যেক হন্তারক আপন অবস্থানে অস্থির।
সর্বপ্রথম যহর বিন কায়স ইয়াযিদকে বিজয়ের সংবাদ শুনাল যে,
হুসাইন ইবনে আলী আটার জন পারিবারিক সদস্য ও ষাটজন বন্ধু-বান্ধব সঙ্গে আমরা পর্যন্ত পৌঁছে। আমরা কয়েক ঘন্টায় তাদের তছনছ করে দিই। এখন কারবালায় তাদের লাশ নগ্ন পড়ে আছে। তাদের কাপড় রক্তে ভেজা। তাদের চেহরা ধূলি-বালিতে মলিন হচ্ছে। তাদের শরীর সূর্যের তাপ ও বায়ুর প্রচণ্ডতায় শুঁটকি হয়েছে।
বিজয়ের সংবাদ শুনে ইয়াযিদ প্রথমে-তো আনন্দে দুলে ওঠল। অধিকন্তু এ ভূ-কম্পনোদ্রেক ও বিপর্যয় অনিবার্যকারী পদক্ষেপের ভয়ানক পরিণতি যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠল, তখন ভয়ে কেঁপে ওঠল। বারংবার বুক চাপড়াতে ছিল যে, হায় এ ঘটনা আমাকে ইসলামের ইতিহাসে চিরকলংকী বানিয়ে দিল। মুসলমানদের অন্তরে আমার প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতার আগুন সর্বদা জ্বলতে থাকবে। হন্তারকের অনুতাপ নিহতের গুরুত্ব বাড়াতে পারে বটে কিন্তু হত্যার অভিযোগ-অভিশাপ তুলে নিতে পারেনা। এ স্থানে অনেক লোক ধোঁকায় পতিত হয়েছে। তাদের উচিৎ মৌলিক ভাবে ঘটনার পর্যালোচনা করা। অতঃপর ইয়াযিদ শাম দেশের শাসকদের আপন মজলিসে আহবান করল, আহলে বায়তকেও একত্রিত করল। ইমাম যয়নুল আবেদীনকে সম্বোধন করে বল্ল, ‘হে আলী! তোমার পিতাই আমার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, আমার রাজ্য ছিনিয়ে নিতে চেয়েছে। এতে আল্লাহ যা কিছু করেছেন, তুমি দেখতে পাচ্ছ।’ প্রত্যুত্তরে যয়নুল আবেদীন কুরআনের একটি আয়াত আওড়ালেন, যার মর্মার্থ এ যে, ‘কোন মুসিবত এমন নেই, যা পূর্ব থেকেই লেখিত হয়নি’।
এতে বহুক্ষণ নীরবতায় আচ্ছন্ন ছিল দরবারমহল। অতঃপর ইয়াযিদ শাহী শাসকদের প্রতি মনোনিবেশ করে বল্ল, আহলে বায়তের এ বন্দিদের ব্যাপারে তোমাদের পরামর্শ কি?
কতেক শাসক অতি কটু কথায় অসদাচরণের পরামর্শ দিল। পরন্তু নোমান বিন বশীর বল্লেন যে, তাঁদের সাথে ওই আচরণ করা চায়, যা রাসূলুল্লাহ (দ.) তাঁদের এ অবস্থায় দেখে করতেন।
ইয়াযিদ নির্দেশ দিল, বন্দিদের রশি খুলে দেওয়া হোক এবং সৈয়্যদানীগণকে শাহীমহলে পৌঁছে দেওয়া হোক।
একথা শুনে হযরত যয়নব কেঁদে ওঠে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বল্লেন, “তুমি আপন রাজ্যে রাসূলযাদীদের গলি-গলি ফেরিয়েছ, এখন আমাদের অসহায়ত্বের তামাশা আপন স্ত্রী-কন্যাদের দেখাবেনা? আমরা মাটিতে উপবেশকারীকে কোন টুটা-ফাটা স্থান দিয়ে দাও যেথা মাথা গুঁজাতে পারি।”
অবশেষে ইয়াযিদ তাঁদের অবস্থানের জন্য পৃথক ঘরের ব্যবস্থা করল। ইমাম (রা.)’র শির মোবারক ইয়াযিদের সামনে রাখা ছিল আর ওই বদবখত নিজ ছড়ি দিয়ে কপাল মোবারকের সাথে বেয়াদবি করতে ছিল। সাহবীয়ে রাসূল আসলামা ধমক দিয়ে বল্লেন, “জালেম! এটি রাসূলের চুমোর স্থান, এটার সম্মান কর”।
শুনে ইয়াযিদ জ্বলে ওঠল কিন্তু সাহবীয়ে রাসূলের বিরুদ্ধে কিছু করার হিম্মত হলনা।
হযরত যয়নব (রা.)’র চাহিদা মত মস্তক মোবারক তাঁদের সোপর্দ করে দেওয়া হল। তিনি সম্মুখে রেখে কাঁদছিলেন। কখনো হযরত শহরবানু ও উম্মে রুবাব বক্ষে লাগিয়ে হারানো দিনের স্মৃতিতে বেভুল হয়ে যেতেন। এক রাতের ঘটনা। অর্ধরাত বয়ে গেল। সারা দামেস্ক নিদ্রার নীরবাতায় নিমগ্ন। দুর্দশাগ্রস্তদের ওপর তারকারাজির আঁখিও তন্দ্রাচ্ছন্ন। হঠাৎ সা’দাতদের বাসস্থান হতে কোন মহিলার কান্না ভেসে এল। মহলের প্রাচীর হেলে গেল। হৃদয়ের আগুনে শূন্যে স্ফুলিঙ্গ ওড়তে লাগল। ইয়াযিদ ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। গিয়ে দেখতে পেল, হযরত যয়নব ভাইয়ের মস্তক কোলে নিয়ে ব্যাকুল চিৎকার করছেন। দুঃখ-বেদনার এক ক্বিয়ামত জেগে ওঠল। ওই বেদনাবিধুর ক্রন্দনে ইয়াযিদের মনে যে ভীতি অনুপ্রবেশ করেছে, তা জীবনের শেষ শ্বাস পর্যন্ত বের হয়নি।
তার শংকা জাগল যে, কলিজা বিদীর্ণকারী এ ফরিয়াদ যদি দামেস্কের দ্বারে-দ্বারে পৌঁছে যায়, তবে তার শাহী মহলের ইট-বালির অস্থিত্বও থাকবেনা। কেননা দামেস্কের জামে মসজিদে আহলে বায়তের মর্যাদা-মাহাত্ম্য ও ইয়াযিদের জোর-জুলুম নিয়ে ইমাম যয়নুল আবেদীন যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তা মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছিল এবং জনমনে তার প্রভাব এখনও অম্লান রয়েছে।
যদি বক্তৃতার ধারাবাহিকতা আরো দীর্ঘ হতো, ভীত হয়ে ইয়াযিদ যদি আযান দিতে না বলত, তবে ওই দিনই ইয়াযিদের শাহী শক্তি ধূলিধূসরিত হয়ে যেত এবং তার বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ত।
এ কারণেই পর দিন নোমান বিন বশীরের নেতৃত্বে ত্রিশজন অর্শ্বসাওয়ার সহ আহলে বায়তের এ লুন্ঠিত কাফেলা মদীনার দিকে প্রেরণ করল।
কারবালার এ জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ ঠান্ডা করার সহস্র প্রচেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু যে অনল জল-স্থলে লেগে গিয়েছিল, তা শীতল হওয়ার নয়- হলওনা। ফজরের নামাযান্তে আহলে বায়তের ভগ্নান্তর কাফেলা মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা দিলেন।
হযরত নোমান বিন বশীর অতি কোমলান্তর, পূতাত্মা ও আহলে বায়ত-প্রেমিক ছিলেন। দামেস্কের নগরদ্বার পেরুতেই ইমাম যয়নুল আবেদীনের খেদমতে উপস্থিত হয়ে সকাতর আবেদন জানালেন যে, এ অনুরক্ত নির্দেশের গোলাম। যেখানে ইচ্ছা তাশরীফ নিন, আমার কষ্টের ভাবনা করবেন না। যেখানেই নির্দেশ করবেন গ্রাহ্য করবো, যখনই বলবেন রওনা দিব।
কতেক লোক বলেন, হযরত যয়নুল আবেদীন ওখান থেকে কারবালায় ফিরে এসে শহীদদের দাফন সম্পন্ন করলেন। কতেক লোক বলেন, কারবালার আশ-পাশের লোকেরা সংবাদ পেয়ে মাতম করতে করতে এসে শহীদগনের কাফন-দাফনের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। শেষোক্ত বর্ণনাই অধিক নির্ভরযোগ্য।
হযরত ইমামে আর্শেমকাম’র মস্তক মোবারক এখন বর্শাগ্রে নয় হযরত যয়নব, শহরবানু ও অসুস্থ আবেদের কোলে রয়েছে। পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, তেপান্তর পেরিয়ে কাফেলা মদীনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মনযিল পরিবর্তন হতেছিল আর হৃদয়ের আকর্ষণ চঞ্চল হয়ে ওঠতেছিল। এমনকি কয়দিন পর হিজাযের পবিত্র এলাকা শুরু হল। হঠাৎ ঘুমন্ত বেদনা জেগে ওঠল। রহমত ও নূরের শাহযাদীরা আপন বাগের বসন্তকাল স্মরণে ব্যাকুল হয়ে গেলেন। কারবালা যাওয়ার সময় কখনো এ রাস্তা দিয়ে গিয়েছিলেন। ইমামত মুলকের এ সম্রাজ্ঞীরা তখন আপন বাদশাহ ও প্রিয়জনদের মমতার ছায়ায় ছিলেন। জীবনের সকাল-সন্ধ্যা মৃদুহাস্যে ভরা ছিল। ফুল-কলিতে পুরো উদ্যান ভরপুর ছিল। চেহরা টুকু উদাস হলে সাহানুভূতিশীলদের ভিড় লেগে যেত। আঁখিতে বিন্দুজল চমকিলে স্নেহ-মমতার সাগরে উচ্ছ্বাস শুরু হত। এখন ওই রাস্তা দিয়ে ফিরছেন তবে পদতলে কাঁটার বর্ষা দাঁড়িয়ে আছে। ছটফট করতে করতে মাথায় কিয়ামত তুলে নিলেও সান্ত্বনা দেওয়ার কেউ নেই। তাবু উজাড় পড়ে আছে, কাফেলা বিরাণ হয়েছে। শাহযাদা ও রাণীদের জায়গায় এখন বিষন্ন ইয়াতিম ও বিধবাদের একটি দল রয়েছে, যাদের শিরোপরে আকাশের ছায়াই কেবল রয়েছে। ওষ্ঠের নাড়া ও ভ্রুক্ষেপে বন্দিদের শিকল ভাঙ্গনকারী আজ নিজেরাই বালা-মসিবতে বন্দি।
মদীনার দূরত্ব কমতে কমতে কয়েক মনযিল বাকি। এখন থেকেই পাহাড়ের বক্ষ কাঁপছে, জমিনের বুক হেলছে। ক্বিয়ামতের ঘর্ম বেরুচ্ছে যে, কারবালার ফরিয়াদি দু’জগতের সম্রাটের নিকট যাচ্ছেন! কাফেলায় হুসাইন নেই, তাঁর কর্তিত মস্তকই যাচ্ছে। সাহায্য প্রার্থনার সবুতের জন্য কোনখান থেকে প্রমাণ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ধড়হীন হুসাইন যখন নানাজানের রওযায় উপস্থিত হবেন, তখন বিলাপের পরিণতি দেখতে কার হুশ অটুট থাকবে।
পরদেশে কারবালার মুসাফিরদের আজ শেষ রাত, আঙ্গারের ওপর এপাশ ওপাশ ছটফট করতে করতে অতি অস্থিরতায় কাটল। অতি প্রত্যুষেই রওনার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন।
নোমান  বিন বশীর আগে আগে চলছেন, তাঁর পিছে আহলে বায়তের সাওয়ারি এবং সব শেষে ত্রিশজন অস্ত্র-সজ্জিত পাহারাদার সিপাহী।
দ্বিপ্রহরের পর মদীনার সীমা শুরু হল। এখন ফরিয়াদিদের অবস্থা পরিবর্তন হতে লাগল। হৃদয়ের আগুন তীব্র হতে শুরু করল। মদীনা যতই নিকটে আসছে, অনুরাগ-আবেগের সাগর ততই উচ্ছ্বাসিত হচ্ছে। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। খেজুর গাছের সারি ও সবুজ উদ্যানের ধারা শুরু হল।
মদীনার আবাদি দৃষ্টিতে পড়তেই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। কলিজা টুটে আহ’র ধোঁয়া বের হল এবং সমস্ত আকাশ ছেয়ে গেল। আশার নীড় দেখে হৃদয়ের আঘাত দগদগে হয়ে ওঠল। হযরত যয়নব, শহরবানু ও অসুস্থ আবেদ উৎসরিত জযবা সংবরণ করতে পারলেন না। আহলে হেরমের বেদনাদায়ক ক্রন্দনে জমিন কাঁপতে লাগলো, পাথরের কলিজা ফেটে গেল।
এক উষ্ট্রী-সাওয়ার বিদ্যুতের ন্যায় সারা মদীনায় এ খবর রটে দিল যে, কারবালা হতে নবীবংশের লুন্ঠিত কাফেলা আসছেন। শাহযাদায়ে রাসূলের ছিন্ন মস্তকও তাঁদের সাথে আছে। এ সংবাদ পেতেই সারা মদীনায় শোর পড়ে গেল। কিয়ামতের আগেই ক্বিয়ামত এসে পড়ল। বেদনার প্রাবল্যে ও অস্থির অনুরাগে মদীনাবাসীরা রাস্তায় বেরিয়ে এলেন। যখনই সামনাসামনি হল এবং চোখে চোখ পড়ল, উভয় দিকে দুঃখ-বেদনার আলোড়নে ক্বিয়ামত  টুটে পড়ল, বিলাপ-আহাজারির শোরগোলে মদীনার আকাশ দুলে ওঠল। হযরত  ইমামের কর্তিত মস্তক দেখে লোকেরা ধৈর্যচ্যুত হলেন। গর্জে-গর্জে কাঁদতে লাগলেন। ঘরে ঘরে  মাতমের সারি বিস্তৃত হয়েছে। হযরত যয়নব ফরিয়াদ করতে করতে মদীনায় প্রবেশ করলেন।
“নানাজান! উঠুন! এখন ক্বিয়ামতের আর অন্য কোন দিন আসবেনা। আপনার সমস্ত বংশ উজাড় হয়েছে। আপনার প্রেমাস্পদ শহীদ হয়েছেন। আপনার পর আপনার উম্মত আমাদের সোহাগ ছিনিয়ে নিয়েছে। দানা-পানি ছাড়া আপনার শিশুদের ধুঁকে ধুঁকে মেরেছে। আপনার হুসাইন আপনার নামের দোহাই দিতে দিতে চলে গিয়েছেন। কারবালার মাঠে আমার কলিজার টুকরো আমারই চোখের সামনে হত্যা করা হয়েছে। আপনার আদরে গড়া বাগান লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে। নানাজান-নানাজান এ কাটা শির নিন। আপনার অপেক্ষায় তার চক্ষু এখনো খোলা। একটু ওঠে আপনার দুর্ভাগা মেয়েদের বেদনাদায়ক অবস্থা দেখুন।”
হযরত যয়নবের এ ফরিয়াদে শ্রোতাদের কলিজা ফেটে গেল। উম্মুল মু’মেনীন উম্মে সালমা, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর, আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর ত্বয়্যার ও আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরের মর্মান্তিক অবস্থা অসহনীয়-অবর্ণনীয়।
হযরত আক্বীলের ঘরের শিশুরা এ বিষাদ-সংগীত গাইতে ছিল, ‘ক্বিয়ামতের দিন ওই উম্মত কি উত্তর দেবে, যখন তাদের রাসূল জিজ্ঞাসা করবে যে, তোমরা আমার পর আমার সন্তানদের সাথে  এ আচরণ করলে যে, তাদের কেউ রক্ত আর মাটিতে লেপ্টে আছে, তলোয়ার, তীর ও বর্শার আঘাতে তাদের শরীর জর্জরিত। তাদের লাশ কংকরময় ময়দানে পড়ে আছে। তাদের মধ্যে কতেক বন্দি রয়েছে, রশির বাঁধনে হাত নীলাভ হয়ে গিয়েছে।’
হযরত সুগরা আছড়ি-পিছড়ি খেয়ে খেয়ে কাঁদছেন। বারবার মা ও ফুফির সঙ্গে লেপ্টে লেপ্টে জিজ্ঞাসা করছেন, আমার আব্বাজান কোথায়, আমার আদরের আলী আসদগরকে কোথায় রেখে এসেছ? বাবাজান বলে গিয়েছিলেন যে, শীঘ্রই ফিরে আসবেন, যে করেই হোক তাঁকে এনে দেন।
ইমামের কর্তিত মস্তক নিয়ে আহলে বায়তের এ লুন্ঠিত কাফেলা যখন রাসূলুল্লাহর রওযায় উপস্থিত হলেন, বায়ুপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেল, কালের ঘূর্ণন থমকে দাঁড়াল, প্রবাহমান স্রোত থেমে গেল, আসমানে কম্পন শুরু হল, সমস্ত জগত নিশ্চুপ যে, আজই না ক্বিয়ামত এসে পড়ে।
ওই সময়ের হৃদয়ভাঙ্গা প্রাণঘাতী দৃশ্য লিখার অতীত। কলমের সাধ্য নেই যে, ওই ছবি আঁকতে পারে, যা মদীনাবাসীদের শত-শত বছর ধরে ছটফট করিয়ে চলছে। অন্তঃপুরের বাসিন্দারা ছাড়া কারো জানা নেই যে, হুজরায়ে আয়েশায় কি হয়েছে? কারবালার ফরিয়াদি আপন নানাজানের রওযা হতে কীভাবে ফিরেছে? আদর-যত্নে পালিত হুসাইনের মস্তক রওযা শরীফের বাইরে ছিল, না রহমতের  খাস দ্যূতিতে ছিল? যখন জন্নাতের ফুলই সাব্যস্ত, তবে পুস্পের আঁখি হতে বাগান-মালিকের কিবা পর্দা? বরযখের দেওয়ালতো পরের জন্য, আপন কোলে পালিতদের জন্য কিবা হিজাব!
হযরত যয়নব, হযরত শহরবানু, হযরত উম্মে রুবাব, হযরত যয়নুল আবেদীন, উম্মে কুলসূম ও সকিনা প্রত্যেকই রহস্য সংরক্ষক ছিলেন। গৃহভ্যন্তরে কি ঘটে ছিল,  কে জানবে? অশ্রুসিক্ত নয়নে রহমতের আঁচল কী ভাবে রাখা হয়েছিল এবং কারবালার ঘটনার অন্তরালে আল্লাহর মর্জির নিগূঢ় রহস্য কোন শব্দে বুঝানো হয়েছে? দেয়ালের পিছনে দণ্ডয়মানদের অদৃশ্য জগতের ওই ঘটনার অবস্থা কিবা জানা?
রাসূলুল্লাহ (দ.)’র রওযা হতে দু’কদম দূরত্বেই ছিল খাতুনে জন্নাতের আরামগাহ। কে জানে, প্রিয়পুত্র কলিজার ধনকে বক্ষে লাগাতে এবং আপন ইয়াতিমদের অশ্রু আঁচলে মুছে নিতে মমতার আতিশয্যে কোন গোপন পথে তিনিও আপন বাবাজানের পবিত্র হেরমে হয়তো এসে পৌঁছেছিলেন।
ইতিহাস শুধু এতটুকু বলে যে, হযরত যয়নব ব্যাকুল আহাজারিতে রক্তাক্ত কাহিনী শুনিয়েছেন। শহর বানু বলেছেন, খান্দানে রিসালতের এক বিধবা আপন স্বামীর সোহাগ হারিয়ে আপনার দ্বারে উপস্থিত হয়েছে।
অসুস্থ আবেদ আবেদন জানালেন, “অনাথত্বের দাগ নিয়ে হুসাইনের শেষ নিশান, এক অসুস্থ আধমারা দয়ানুগ্রহ ও ধৈর্য-সহ্য ভিক্ষা চাই”।
কান্না-আহাজারির তরঙ্গমান সাগর থেমে যাওয়ার পর দু’জগতের যুবরাজ হযরত ইমাম আলী মকাম (রা.)’র মস্তক মোবারক স্নেহময়ী জননী হযরত সৈয়দাহ ফাতেমা (রা.)’র পাশে সমাধিস্থ করা হল।
সমুদ্রের বিক্ষিপ্ত বিন্দু ফের সমুদ্রে গিয়ে মিল্ল, ফের উদ্বেলিত তরঙ্গ তাকে বুকে টেনে নিল।
“এসেছিলাম সাগর হতে প্রেমের উত্তাল তরঙ্গে
তরঙ্গ শেষে ফের মিশব গিয়ে একদা নিজ মূলে।”
সম্পূর্ণ প্রবন্ধ “আলেয়া নয় আলো” পুস্তক থেকে সংকলিত । 
No photo description available.