লেখকঃ  আল্লামা বোরহান উদ্দীন মুহাম্মদ শফিউল বশর
[ “মুক্তিধারা”৩য় বর্ষ ১ম সংখ্যা জানুয়ারী ২০১৩ হতে ]
মক্কা-মদিনা ইসলামের সূতিকাগার। সুতরাং ওখানকার সভ্যতা-সংস্কৃতি, পরিবেশ-পরিস্থিতি মুসলিম মাত্রই ইসলামিক ধারণা করা স্বাভাবিক। আবু লাহাব, আবু জাহল ও ওলীদ বিন মুগীরা হতে শুরু করে মুসায়লামা, সাজাহ, আসওয়াদ আনসী, তুলায়হা আসাদী প্রমুখ বহিঃশত্রু, মুনাফিক ইবনে সাবা, খারিজী, আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব রাশিবী, শবীব ও আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম প্রমুখ দলত্যাগী শত্রু, ইসলামের ছদ্মাবরণে ক্ষমতালিপ্সু ইয়াযীদ, ইবনে যিয়াদ, আমর সা‘আদ ও মুসলিম বিন উকবাহ’র নাশকতা, নির্মমতা, জ্বালাও-পোড়াও আর মার-ধর বিশেষত: আব্দুল ওহাব নজদী, মুহাম্মদ ইবনে সাউদ, আব্দুল আযীয বিন মুহাম্মদ, সাউদ বিন আব্দুল আযীযসহ আলে সাউদের বর্বরতা-নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতা, ইসলামী নিদর্শন বিধ্বংস ও সুন্নী-মুসলিম নিধনযজ্ঞ সম্পর্কে যারা অজ্ঞাত, তারাতো সৌদি সরকার ও তার বেতনভুক কর্মচারীদের মডেল বানিয়ে নেন।
কথায় কথায় বলেন, আরব বিশ্বের কোন মিনারায় আযানের পূর্বে সালাতুচ্ছালাম পরিবেশিত হয়না, তথায় বৃহদায়তন মাযার আর বিরাট-বিরাট গম্বুজ নেই ইত্যাদি-ইত্যাদি। সুতরাং এসব বিদআত, হারাম, কুফর আর শিরক। অথচ তারা জানেননা, এক কালে সবই ছিল, এখন নেই। কেন নেই? জানতে আমাদের সাথে এগিয়ে চলুন, ঐতিহাসিক পরিক্রমণে ঘুরে আসি মক্কা, মদিনা, কূফা, কারবালা, তায়েফ, নজদ, পাকিস্তান, ভারত আর বাংলা। চলুননা দেখে আসি মুসলিম বিশ্ব কেমন ছিল আর তারা কেমন বানিয়েছে বা বানাতে চাচ্ছে। জেনে নিই জঙ্গিবাদের কলংক তিলক আমাদের ললাটে কেন এঁটে দেওয়া হয়েছে।
সিফ্ফিনের যুদ্ধ ও দুমাতুল জান্দালের তথাকথিত মীমাংসার পর আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব আল রাশিবীর নেতৃত্বে ১২ হাজার সমর্থক হযরত আলী (রাদ্বি.)’র দল ত্যাগ করে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করতঃ হারুরায় অবস্থান নিয়ে ইরাক ও ইরানে হত্যা, লুণ্ঠন ও গোলযোগের সৃষ্টি করে। ইতিহাসে তারাই খারেজী নামে পরিচিত। এ খারেজী সম্প্রদায় নাহরাওয়ানে সমবেত হলে ৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে হযরত আলী (রাদ্বি.)’র সঙ্গে সংঘর্ষে তাদের শক্তি প্রায় ধ্বংস হয়। পরন্তু এ উগ্রপন্থী তাদের তৎপরতা বন্ধ রাখেনি। তাদের পক্ষে কোন মুসলিম মত না দিলে তাকে ধ্বংস করা অবশ্য কর্তব্য মনে করত। খুন, গুপ্তহত্যা আর অগ্নি-সংযোগ ছিল তাদের অন্যতম কর্মসূচী। খুনে খারিজী আব্দুর রহমান ইবনে মুলজামের হাতেই হিজরী ৪০ সালের ১৭ রমযান (৬৬০ খ্রিস্টাব্দ) হযরত আলী (রাদ্বি.) শাহাদত বরণ করেন।
৬১ হিজরীর ১০ মুহররম কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশ্বমুসলিমের অন্তর ইয়াযীদের প্রতি ঘৃণার উত্তাল সাগর ও বিক্ষোভের তপ্তানলকুণ্ডে রূপ নেয়। ইয়াযিদী বর্বরতার চোট মদীনাবাসীরা একটু বেশিই অনুভব করেন। ফলতঃ তারা ইয়াযীদ কর্তৃক নিয়োগকৃত মদীনার গভর্নর ওসমান বিন মুহাম্মদকে ক্ষমতাচ্যুত করে উমাইয়াদের গৃহবন্দী করে রাখেন এবং মদীনার সরকার ও শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য মুহাজিরদের পক্ষে আবদুল্লাহ ইবনে মুতী আর আনসারদের পক্ষে ইবনে হানযালাহকে আমীর মনোনীত করেন। মদীনাবাসীদের ওই পদক্ষেপ অহঙ্কারী ও প্রবৃত্তির পূজারী ইয়াযীদের মোটেও সহ্য হলনা। সুতরাং সে কালবিলম্ব না করেই মুসলিম বিন উকবাহ’র নেতৃত্বে মদীনা অভিমুখে ১২ হাজার সৈন্য প্রেরণ করল। সেনাপতিকে বিশেষ নির্দেশ দিল যে, যদি মদীনাবাসীদের সাথে সংঘর্ষ লেগে যায়,  তবে কোন প্রকার ছাড় দিবেনা এবং তিন দিন পর্যন্ত গণহত্যা চলাবে।
শাম দেশীয় সৈন্যরা বায়ুর বেগে মদীনা পৌঁছে পুরো শহর অবরুদ্ধ করে নিল। শত্রু বাহিনীর আগমন আশঙ্কায় মদীনাবাসীরা পূর্ব থেকেই রক্ষণাত্বক পদক্ষেপ স্বরূপ মদীনার চতুর্পাশ্বে পরিখা খনন করে নিয়েছিলেন। সুতরাং শামী সৈন্যরা অতর্কিত হামলা করতে পারেনি। শুরু হল সংবাদ বিনিময়। তারা পুনর্বার ইয়াযীদের বায়‘আত নতুবা যুদ্ধের পয়গাম পৌঁছালে মদীনাবাসীরা পরিষ্কার উত্তর দিলেন যে, নিজেদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বাস্তবায়ন ও ঈমানের স্বার্থে প্রাণ দিয়ে দিব কিন্তু ফাসিক-ফাজির-মালাঊন-অপদার্থ  ইয়াযীদের আনুগত্য গ্রহণ করবোনা।
ইয়াযীদ প্রেরিত সেনাপতি মুসলিম বিন উকবাহ তৃতীয় দিবসে হামলা শুরু করে দেয়। মদীনাবাসীরা স্বল্প সংখ্যক হওয়া সত্ত্বেও ওই অস্ত্র-শস্ত্র সজ্জিত বিশাল বাহিনীর ভয়াবহ আক্রমণ প্রতিহত করেন। পরন্তু তাঁরা বেশিক্ষণ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে না পেরে পিছু হটেন। মুসলিম বিন উকবাহ মদীনার পবিত্রতা ও ফযিলতের কোনরূপ ভাবনা-চিন্তা না করেই সাধারণ লুটপাঠ ও খুন-হত্যার নির্দেশ দিয়ে দিল। এ নাম সর্বস্ব মুসলমান হিংস্রজন্তুরা মানবতা ও ভদ্রতার সমুদয় মর্যাদা তাকের উপর রেখে পবিত্র শহরে ঢুকে বেয়াদবির এমন ঝড়-তুফান বইয়ে দিল, যা ভাবতেই লোম হর্ষিত হয় আর ভদ্রতা মুখ লুকায়। এমন কুৎসিত, কলঙ্কিত ও মানবতা বিবর্জিত আচরণ করেছে, যা এক হীন ও বিকৃত রুচির শত্রুকেই মানায়। তিন দিন পর্যন্ত এ হাঙ্গামা চলল, চতুর্থ দিবসে  অন্যায়-অবিচারের এ কাল মেঘ কিঞ্চিৎ সরে গেল আর শহরবাসীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এ সময়ে না কারো সম্ভ্রম রক্ষিত ছিল, না জানমাল। শামীরা প্রায় সাতশত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের শহীদ করে, যাদের মাঝে শীর্ষস্থানীয় সাহাবী, প্রসিদ্ধ ও বরেণ্য আলেম-ওলামা আর বুযুর্গও ছিলেন। এ ছাড়া দশহাজার সাধারণ মুসলিম ওই গণহত্যার শিকার হন।
বিপদের এ ঝড় টুকু থামতেই মুসলিম বিন উকবাহ দরবার বসাল। তার চাচাত বোন এসে বলল, অমুক যায়গা হতে আমার উট না নিতে সিপাহীদের নির্দেশ দাও। সে তার গোমাস্তাদের বলল, প্রথমে তার উটই নিয়ে এসো। অন্য এক মহিলা আপন পুত্রের জন্য সুপারিশ করা মাত্রই ফরিয়াদী মায়ের সামনেই তাকে হত্যা করিয়ে দিল। আমর বিন ওসমানের দাঁড়ির এক একটি পশম তুলে নিল।
ওই বর্বরতা ও আতংকে চতুর্দিকে কম্পন ছড়িয়ে পড়ল। লোকেরা যেখানেই আশ্রয়স্থল দেখতে পেল, সেখানেই আত্মগোপন করল।
হযরত সাঈদ বিন মুসায়্যাব বলেন, ওই আকষ্মিক বিপদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য আমি মসজিদে নববীর দিকে পলায়ন করি। ওই হিংস্রজন্তুদের হাত থেকে এখানেও নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করলে রওযায়ে আকদসে চলে যাই। তিন দিন পর্যন্ত ওখানে আত্মগোপন করে থাকি। ওখানে এমন ঈমান-দ্বীপ্তিবিচ্ছুরক দৃশ্যাবলী অবলোকনের সৌভাগ্য হয়েছে যে, সকল দুঃখ-চিন্তা ভুলে গিয়েছি। রহমতে আলম (দ.)’র দয়ার দৃষ্টি এমন অনুগ্রহ করেছেন যে, তার আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। যখনই নামাযের সময় হতো, রওযা শরীফ হতে যথারীতি আযানের সুরধ্বনি অনুরণিত হতো এবং কিছুক্ষণ পরই ইকামতের শব্দ ভেসে আসত। আমার জন্য এ ধ্বনি এতই চিত্তাকর্ষক ছিল যে, তার স্বাদে আমি যে রক্ত পিপাসু শত্রুর ভয়ে এখানে লুকিয়ে আছি, তাও ভুলে যাই।
আযান হেতু নামাযের সময় জ্ঞাত হতেন আর যথাসময়ে নামায আদায় করে নিতেন। এ ভাবে তিন দিন পর্যন্ত নবী (দ.)’র সান্নিধ্যে অবস্থান করে মনোপ্রাণ সুস্থির ও ঈমান-ঈক্বানের দৃঢ়তা সঞ্চয় করেন। হায়াতুন্নবী (দ.)’র চিরন্তনতা পর্যবেক্ষণ ও অবলোকনে বক্ষ আলো ও আনন্দে পরিপূর্ণ করে দৃঢ়তা-অবিচলতায় ভরপুর হয়ে বেরিয়ে এলেন।
অতঃপর সিপাহীরা তাকেও ধরে নিয়ে এল মুসলিম বিন উকবাহ’র নিকট। পরন্তু রওযা শরীফে প্রকাশিত অলৌকিক মাহত্ম্যে তিনি এতই বিভোর ও মত্ত ছিলেন যে, পাগল মনে করে ছেড়ে দিল।
আল্লাহ তা’আলা মুসলিম বিন উকবাহ থেকে মদীনা মুনাওয়ারা অবমাননার এ রূপ প্রতিশোধ নিলেন যে, কয়দিন পরেই সে মরে গেল। এটি ৬৩ হিজরীর শেষের দিকের ঘটনা। অতঃপর ইয়াযীদও আপন ঠিকানায় পৌঁছে যায়; যার হুকুমতের ভিত পোক্ত করার জন্য সেনাপতি মুসলিম এত জঘন্য অপরাধ করে। এ রক্তাক্ত দুর্ঘটনা ইতিহাসে ‘হাররাহ’র ঘটনা নামে অভিহিত।
১১১১ হিজরী মোতাবেক ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে কুখ্যাত ভণ্ড নবী মুসায়লামার জন্মভূমি পাথুরে নজদে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর জন্ম। গ্রাম্য পরিবেশে শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের উচ্ছৃঙ্খল সময় অতিবাহিত হওয়ার গেঁয়ো স্বভাবের সমূহ উগ্রতা, সংকীর্ণতা, নিষ্ঠুরতা, কুরীতি ও কুরুচি তার ব্যক্তিত্বে বদ্ধমূল হয়ে যায়। তাছাড়াও ভণ্ডনবী মুসায়লামা, সাজাহ, আসওয়াদ আনসী ও তুলায়হা আসাদী প্রমুখের জীবন-কর্ম জানার প্রবল আগ্রহী ছিল; যেহেতু সে রাসূলুল্লাহ (দ.), সাহাবী তাবেয়ী ও আইম্মায়ে মুজতাহেদীনদের আনুগত্যের বোঝা বহনে অসম্মত আর নিজের জন্য শর্তহীন স্বাধীন আনুগত্যের প্রয়াসী ছিল। অবশেষে সে পন্থা সুগম করার জন্য তৌহীদের আড়ালে রেসালত-নবূয়তের মূলে কুঠারাঘাত হানতেও কুণ্ঠিত হলনা। বিশ্ব মুসলিমের আক্বিদা-বিশ্বাসের বিপরীত নবী করীম রাউফুর রহীম (দ.)’র পবিত্র জীবন, ওসীলাহ ও শাফা‘আতকে নেতিবাচক রীতিতে বিশ্লেষণের আপত্তিকর ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ পদ্ধতি গ্রহণ করে। কাফির-মুশরিকদের ক্ষেত্রে অবতীর্ণ পাক কুরআনের আয়াত সমূহকে মুসলমানদের ওপর প্রয়োগ করে সারা বিশ্বের মুসলমানকে কাফির-মুশরিক আখ্যা দিয়ে তাদের জান-মাল ও সম্ভ্রম সংহার বৈধতার ফতওয়া জারী করে। এ মনগড়া আক্বিদা-বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার এক সংগ্রহ ‘কিতাবুত তৌহীদ’ নামে গ্রন্থিত করে তার প্রতি মানুষদের আহ্বানের নীলনক্সা বাস্তাবায়নের উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম নিকটবর্তী এলাকা আয়্যুবুনিয়ার গোত্রপতি ইবনে মুয়াম্মারকে নির্বাচন করল এবং একদা নিজের পয়গাম নিয়ে তার নিকট পৌঁছল। ইবনে মুয়াম্মার এ অত্যাশ্চর্য ধ্যান-ধারণার বিষয়ে জ্ঞাত হয়ে হতবুদ্ধি হয় ঠিকই, কিন্তু গেঁয়ে স্বভাবের অধিকারী তদুপরি ওই নূতন মাযহাবের মাধ্যমে রাজনৈতিক ভিত সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হওয়ার কিরণ দেখতে পেয়ে ভেবে-চিন্তে অবেশেষে গ্রহণে সম্মত হল।
কামিলীনদের রূহানী শক্তির প্রভাব ও তাদের মাযার শরীফ ঘিরে মুসলমানদের ঐক্য প্রাচীর ও ধর্মীয় অনুপ্রেরণা সুসংহত হচ্ছে দেখে তা বিধ্বংসে আশ-পাশস্থ সাহাবীয়ে রাসূল (দ.)’র মাযার নিধনকেই প্রথম টার্গেট স্থির করে। অতএব কোদাল-কুঠার কাঁদে নিয়ে নিজ ধারণা মতে এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ কাজ সমাধা করতে অভিষ্ট স্থান পানে যাত্রা দিল; যেন কোন দুর্জয় দুর্গ বিজয়ে ছুটেছে কিংবা কোন কাফির অধ্যুষিত এলাকায় জিহাদী উৎসাহ-উদ্দীপনায় জোর কদমে আগুয়ান। পরন্তু এ বিধ্বংসী সরঞ্জাম নিয়ে পৌঁছল কোথা? যেখানে মাহবূবে খোদা (দ.)’র প্রিয় সাহাবায়ে কিরাম (রাদ্বি.)’র মাযার ছিল; যাদের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (দ.)’র ঘোষণা যে, হিদায়াতের নক্ষত্র ও আঁধারের আলো।
বড়ই নিষ্ঠুরতা, চরম পাশবিকতা ও অতি সম্ভ্রমহানিকর রীতিতে পুণ্যাত্মা সাহাবীদের শেষ বিশ্রামাগার ধ্বংস করে, গম্বুজ ভেঙ্গে, নূরানী কবর চুরমার করে বিজয়ী ভঙ্গিতে প্রত্যাবর্তন করল। সকলই জেনে গেল যে, ওহাবী আন্দোলনের অভিযাত্রা কোন পথে? মুসলমানদের গর্বযোগ্য পূর্ববর্তী মহাত্মা সত্তা ও তাঁদের মাযারের ক্ষেত্রে তারা কিরূপ ধারণা পোষণ করে? তারা কেমন লোক, যারা মুসলমানী দাবীর সাথে মুসলমানীরই নিদর্শন মুছে দিতে অস্থির?
সাওয়ানাহে ইবনে সাউদ প্রণেতা সরদার মুহাম্মদ হাসনী বি.এ লিখেছেন, ‘শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য সমমনা ছিল আয়্যুবুনিয়ার গভর্নর ওসমান বিন মুয়াম্মার। শায়খ তার থেকে মাযারসমূহ ও তদসংশ্লিষ্ট স্থাপনা বিধ্বংসে সাহায্যের শপথ নিলে সে তা কবুল করে। উভয় যুক্তি করে জলীলাহ গিয়ে তথাস্থ সাহাবীয়ে রাসূল (দ.)’র মাযার ধ্বংস এবং বৃক্ষাদি নিধন করল’।
ইবনে মুয়াম্মার আলহিসা রাজ্যের শাসনকর্তা সুলায়মানের অধিনে ছিল। তিনি মুয়াম্মার ও শেখুন নজদীর দুষ্কর্মের সংবাদ পেয়ে ঈমানী উদ্দীপনায় উদ্দীপিত হয়ে মুয়াম্মারকে নির্দেশ দিলেন যে, নজদীকে শীঘ্রই নির্বাসন দাও অন্যথায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শেখে নজদীর মন-মগজ হতে তৌহীদের সকল নেশা তিরোহিত হল, আল্লাহকে ভয় করার স্থলে এক হাকিমের শাস্তির ভয়ে আয়্যুবুনিয়া ত্যাগ করে দরঈয়ার আমীর মুহাম্মদ ইবনে সাউদের নিকট আশ্রয় নিল। ওই সময় হিজাজের হাকিম ছিলেন, মাসউদ বিন সাঈদ (১১৪৬-১১৬৫ হিজরী) আর ইসলামী বিশ্বের অধিপতি ছিলেন, রোম সম্রাট মাহমুদ খান আওয়াল (১১৪৩-১১৬৮ হিজরী)।
শেখুন্ নজদী আলহিসার হাকিম সুলায়মানের বিরুদ্ধে নির্বাসনের প্রতিশোধ গ্রহণের মতলবে নূতন মাযহাবের আড়ালে তলে-তলে অগ্রসর হতে শুরু করল। পরন্তু সে তার আশ্রয়দাতা ইবনে সাউদকে সম্মত করতে অসমর্থ হলেও লেগে রইল। অবশেষে ইবনে সাউদের স্ত্রী ও ভাইকে প্রভাবিত করতে সমর্থ হল এবং উভয়ের প্রচেষ্টায় আমীরের আস্থাভাজন হয়ে ওঠল। আমীরও এ নব ধর্মমত প্রচারের অন্তরালে রাজ্যের বিস্তৃতি ও বিরোধীদের দমনের উজ্বল সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে সম্মত হল। ইবনে সাউদের জীবনী লেখক লিখেছেন, ‘আমীর ও শায়খের মাঝে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের স্বীকৃতি হল; অতএব তরবারী ইবনে সাউদের ছিল আর মাযহাব শেখ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর’।
শেখে নজদীর ওহাবী মতাবলম্বী যথেষ্ট শক্ত-সমর্থ গ্রাম্য লোক পেয়ে ইবনে সাউদের সৈন্যবাহিনী সমৃদ্ধ হলে উভয়ে মিলে আশ-পাশে নাশকতার সিদ্ধান্ত নিল। এ ধারাবাহিকতায় প্রথমে রিয়াদের আমীর ইবনে দাওয়াসকে ওহাবী মাযহাব গ্রহণের পয়গাম পৌঁছাল। তিনি মাথা-মুণ্ডু বিহীন কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থি ধর্মমত গ্রহণে অসম্মত হলে শক্তির নেশায় মত্ত শেখে নজদী ও দরঈয়ার আমীর রিয়াদ আক্রমণ করে দখল প্রতিষ্ঠা করে। অতঃপর আলহিসার হাকিমের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ছোট্ট ছোট্ট এলাকায় বিভক্ত বিপুল ওহাবী সৈন্যের মোকাবিলায় আমীর সুলায়মান পরাজিত হন। দখলকৃত এলাকার সুন্নী-মুসলিম জন গোষ্ঠীকে ওহাবী ধর্মমত গ্রহণে বাধ্য করা হত। ঐতিহাসিক হাসনী বি.এ সাহেবের বর্ণনা মতে জানা যায়, ‘শেখে নজদী ও তার ওহাবী দোসর আমীর নূতন এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা মাত্রই তরবারীর জোরে অধিবাসীদের ওহাবী আক্বিদা গ্রহণে বাধ্য করত। যার প্রমাণ এ যে, কোন এলাকার সাথে যুদ্ধ লেগে ওহাবী প্রতাপ কমজোর হতেই বাসিন্দারা ওহাবী আক্বিদার সাথে বিদ্রোহ করে সুন্নী-মুসলিম শত্রুদের পক্ষ নিত। পরন্তু ওই সব যুদ্ধে ইবনে সাউদেরও এ ক্ষতি হত যে, তরবারীর জোরে তৌহিদী জনতা বানানো ওই সকল গোত্র শত্রুর আগমনের পদধ্বনি শুনতেই (শেখ ও আমীর) উভয়ের বিদ্রোহী হয়ে যেত এবং আক্রমণকারীদের সাথে নিষ্পত্তি হতে না হতে বিদ্রোহ দমনে উভয়কে আত্মনিয়োগ করতে হত’।
ওহাবীরা নিজেদের বড় একত্ববাদী ও কুরআনের অনুসারী দাবী করা সত্ত্বেও কোন দলীলের ভিত্তিতে সর্বসাধারণকে ধর্মান্তরিত হতে  বাধ্য করত বোধের অগম্য। অথচ কুরআনে পাকের ঘোষণা: ‘লা ইকরাহা ফীদ্দীনি’ অর্থাৎ ‘ধর্মে কোন জোর-জবরদস্তি নেই’। মনে হয়, উদ্দেশ্য কেবল রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন; তা যেভাবে হোকনা কেন, যদি কুরআনের নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপও করতে হয়! বিশুদ্ধ-অন্তর ও নিষ্ঠার সাথে কুরআন-সুন্নাহর দিকে আহ্বানকারী আল্লাহর নির্দেশ ও হিদায়তের এরূপ বিরুদ্ধাচরণ কখনো করতে পারে না।
১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ ইবনে সাউদ মৃত্যু বরণ করলে তার পুত্র আব্দুল আযীয (১৭৬৫-১৮০২ খ্রিস্টাব্দ) ক্ষমতার লাগাম কষে ধরে। ইতঃমধ্যে হুকুমত ও ওহাবীয়্যাতের অবস্থান যথেষ্ট দৃঢ় হয়ে ওঠেছিল। যে নবধর্মমত নজদী শেখকে একটি ছোট্ট অঞ্চল হতে বের করে বৃহত্তর রাজ্য ও বিপুল জনতার সমাবেশ দানিয়েছে, সে তার প্রচার-প্রসারে দিবারাত্র মনোপ্রাণে নিয়োজিত। যে কেউ তাদের ভ্রান্ত ধর্মমত গ্রহণে অসম্মত হতো তাকে হত্যা কিংবা কঠোর শাস্তি দিতেও কুণ্ঠিত হত না। গুম্বদে খদ্বরার যিয়ারতে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হল। মদীনায়ে তাইয়্যেবাহর পানে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফরের অনুমতি কারো জন্য অবারিত ছিলনা। যদি কোন যিয়ারতকারীর খোঁজ পেতো, তাকে লাঞ্ছিত ও বিদ্রুপ করতো।
 
দরঈয়ার নিকটবর্তী ইহসা নামক স্থানের কতেক মুসলমান হৃদেয়র অস্থির করা উদ্দীপনায় মত্ত হয়ে সর্বপ্রকার বিপদ ও ভয়ানক পরিণতির অনুভূতি সত্ত্বেও প্রেম-ভালবাসার চিরবসন্তী পুস্পহার গলে দুরূদ আর না’তের সুর তোলে হাবীবে খোদা (দ.)’র রওযা শরীফ যিয়ারতে যাত্রা দিলেন। নবী (দ.)’র কলিমা পাঠের দাবীদার তথাকথিত তৌহিদী জনতা ওই সংবাদ পেয়ে তাঁদের পথে ওঁৎ পেতে বসল। তাঁরা রওযায়ে আনওয়ার যিয়ারতের মাধ্যমে অন্তরাত্মা সুস্থির করে প্রত্যাবর্তন কালে দরঈয়ার নিকট পৌঁছলে ওহাবীরা তাঁদের পাকড়াও করে। শেখে নজদী তাঁদের দাঁড়ি মুণ্ডিয়ে দিয়ে গাধার পিঠে উল্টো বসিয়ে ইহসার দিকে রাওনা করিয়ে দিল। (আদদরুস্ সুন্নিয়্যা ৪০ পৃষ্ঠা)  
হুযুর নবী করীম (দ.)’র বারগাহে রিসালতে দুরূদ ও সালামের নযরানা পেশ করতেও শেখুন্ নজদী তার অনুসারী ওহাবীদের বারণ করে। দুরূদ শরীফের পূতপবিত্র নূরাণী শব্দাবলীতেও সে বহু কষ্ট অনুভব করত। রওযায়ে আকদসের সমীপে দুরূদ পড়াও সহ্য করতোনা।
জনাব হুসাইন আহমদ মাদানী ওহাবীদের সমমতের হওয়া সত্ত্বেও তাদের ব্যাপারে লিখেছেন, ‘মসজিদে নববীতে গেলেও নবী করীম (দ.)’র পবিত্র সত্তার ওপর না দুরূদ ও সালাম পড়ত; না সেদিকে মুখ করে দু‘আ প্রার্থনা করত’ (আশশিহাবুস্ সাক্বিব ৪৬ পৃষ্ঠা)। আল্লামা সৈয়দ আহমদ যায়নী দাহলান নজদীদের বিষয়ে লিখেছেন, ‘সে নবী করীম (দ.)’র ওপর দুরূদ পড়তে নিষেধ করতো এবং দুরূদ শুনে কষ্ট অনুভব করতো’ (আদদরুস্ সুন্নিয়্যা ৪০ পৃষ্ঠা)। এক সুরেলা অন্ধ মুয়াযযিনকে সে মিনারায় দুরূদ পড়তে নিষেধ করে কিন্তু ওই অকৃত্রিম নবী-প্রেমিক নিবৃত্ত হলনা। সে (নজদী) তাঁকে হত্যা করতে নির্দেশ দিল। অতএব তাঁকে নির্মমভাবে শহীদ করে দেওয়া হয় (প্রাগুক্ত ৪১ পৃষ্ঠা)।
ওহাবীরা নজদ ও আশ-পাশের অঞ্চলে যখন ফিৎনা-ফ্যাসাদ, গোমরাহী ও বদ-আক্বিদার দুর্গন্ধময় কর্মযজ্ঞ জোরালো ভাবে চালাচ্ছিল, তখন তুর্কী বাদশাহ গাযী আব্দুল হামীদ খানের (১১৮৭-১২০৩ হিজরী) শাসনকাল ছিল। তাঁর কর্তৃত্ব গ্রহণপূর্ব থেকেই এ জঘণ্য কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল বটে, কিন্তু তখনো ওই নব মাযহাবের আজগবি ও অনৈসলামি ধ্যান-ধারণার সংবাদ তথা পর্যন্ত পৌঁছেনি। এমনকি হিজায প্রশাসন ও সর্বসাধারণ তখনো ওই সম্প্রদায়ের মূলনীতি, উদ্দেশ্য-লক্ষ্য, আকৃতি-প্রকৃতি ও চৌহদ্দি সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিল। হিজায অধিপতি শরীফ মাসউদ বিন সাঈদ (১১৪৬-১১৬৫ হিজরী) এর কানে এ অদ্ভুত সংবাদ পৌঁছলে তিনি বিষম আশ্চর্য হন। কেননা এক কলিমা পড়–য়ার নবী করীম (দ.)’র যিয়ারতকে বিদ‘আত ও হারাম বলা কিংবা দুরূদে পাকে কষ্টানুভব করার সংবাদ সত্যিই অত্যাশ্চর্যের বিষয়। তার শাসনামলে নজদের ওহাবীরা মক্কা মুকাররমায় গিয়ে ওই নব ধর্মমত প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয়। অতএব এ কাজের জন্য ত্রিশজন পণ্ডিতকে নির্বাচন করে তথা প্রেরণ করে। হরম শরীফে পৌঁছতেই তাদের ডেকে এক ওলামা বোর্ডের সম্মুখে পেশ করা হয়। আক্বিদা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেল, এরা বিলকুল বদ-আক্বিদা, গণ্ডমূর্খ ও মন্ত্রমুগ্ধ; উত্তর দেওয়াতো দূরে থাক, কথা বুঝতেও সক্ষম নয় (আদদরুস্ সুন্নিয়্যা ৪৩ পৃষ্ঠা)।
শরীফ মাসউদ তাদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেন এবং হরম শরীফে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। নজদী ওহাবীরা তাদের সঙ্গীদের ভীতিকর পরিণতির সংবাদ পেয়ে অগ্নিশর্মা হয়ে প্রতিশোধের প্রস্তুতি শুরু করল কিন্তু হিজায প্রশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষের মতো অবস্থান তখনও তাদের গড়ে ওঠেনি।
শরীফ মাসউদের ইন্তেকালের পর তাঁর ভাই মুসাঈদ প্রশাসক হলেন। তিনিও তাঁর আমলে ওহাবীদের হিজায প্রবেশের অনুমতি দেননি।
নজদের শাসনকর্তা আব্দুল আযীযের আমলে লুটপাট, ডাকাতি, অপহরণ, নাশকতা ও ওহাবীয়্যাতের প্রচারধারা প্রবাহমান ছিল। সে শেখুুন্ নজদীর পুরো সমর্থন, সহায়তা ও তত্ত্বাবধানধন্য ছিল। শেখ গ্রাম্য লোকদের আপন ধ্যান-ধারণায় প্রভাবিত করে ওহাবীয়্যাতের ফাঁদে ফাঁসতে আর আমীরের ফৌজে লোক বাড়াতে রইল। এতে করে গোঁয়ার, নিরক্ষর, জেদী, পরিশ্রমী গেঁয়ে লোকের বিরাট এক সৈন্যবাহিনী তার ঝাণ্ডা তলে সমবেত হল। আব্দুল আযীযকে বিনামূল্যে বিপুল সংখ্যক বশংবদ, দ্বীনে ইসলামের বিপরীত চিন্তা ও নাশকতার বীজ বুননকারী উপহার দিয়ে শেখুন নজদী সাহেব ১২০৭ হিজরীতে এ ফিৎনা-ফ্যাসাদের কারখানায় আপন অনুগামী রেখে বিচার ও প্রতিদানের জগতে পাড়ি জমাল। পশ্চাতে রেখে গেল সংস্কারের নামে দ্বীন-ধর্মের সাথে সঙ্গতিহীন মন্দ আবিষ্কারে ভরা নষ্ট-ভ্রষ্ট একটি মাযহাব; যা তাকে কবরেও মন্দ আবিষ্কারের কার্যত প্রায়শ্চিত্ত বুঝাতে থাকবে।
মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব (১১১১-১২০৭ হিজরী) নজদী প্রতিষ্ঠিত ওহাবী মাযহাব তার অনুসারীদের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আরব ভূখণ্ডে ওহাবী বর্বরতার বর্ণনাত্তোর ভারতীয় উপমহাদেশে ওই বর্বরতার সংক্রমন প্রাসঙ্গিক আলোচনার অভিমুখে আমাদের অভিযাত্রা।
উপমহাদেশে ওহাবীয়্যাত প্রচার-প্রসার-প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট বর্ণনায় আল্লামা শায়খ আহমদ বিন হাজর বিন মুহাম্মদ আলে আবু ত্বামী আলে ইবনে আলী (বিচারক শরয়ী বিচারদালাত- কাতার) লিখিত, শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ আলবায্ সম্পাদিত, সাউদী বাদশাহ ফায়সাল বিন আব্দুল আযীয আলে সাউদের নির্দেশে বিনামূলে বিতরণের জন্য মক্কা মুকাররামাহস্থ রাষ্ট্রীয় প্রেসে মুদ্রিত ‘আশশায়খ মুহাম্মদুবনু আব্দিল ওহাব-আক্বিদাত্হুস্ সালফীয়্যাহ ওয়া দাওয়াতুহুল ইসলাহীয়্যাহ ওয়া সানাউল উলামায়ি আলাইহি’ গ্রন্থে বিবৃত,
“ওহাবী আন্দোলন সুদানের ন্যায়  হিন্দুস্তানের  কতেক অঞ্চলেও হিন্দের সাইয়েদ আহমদ নামের একজন হাজীর মাধ্যমে বিস্তৃতি লাভ করে। লোকটি হিন্দের মোড়ল শ্রেণীর ছিল। ১৮১৬ খৃস্টাব্দে বিশুদ্ধ ইসলাম গ্রহণের পর তিনি হজ্ব সমাপনে হিজায গমন করেন। মক্কায় যখন তিনি ওহাবীদের সাথে মিলিত হন, তখন তাদের আন্দোলনের বিশুদ্ধতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একমাত্র ঈমানদার মাযহাব জ্ঞানে সে দলের প্রচারক হয়ে যান। নিজেদের একমাত্র ঈমানদার জ্ঞান করার আকিদা তাদের ওপর ভর করে। তিনি ১৮২০ খৃষ্টাব্দে বাংলা হয়ে যখন নিজ দেশ হিন্দুস্তানে প্রত্যাগমন করলেন, তখন ধর্মীয় আস্থা বিশ্বাস ও আচারানুষ্ঠানে বহুলাংশে হিন্দুয়ানা বিশ্বাস ও প্রথামিশ্রিত মুসলিম অধিবাসীদের মাঝে দাওয়াতের (ওহাবী মতবাদ প্রচারের) এক মসৃণ ময়দান পেয়ে যান। তিনি ‘বিত্তিন’ নগরে আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেন। তিনি সেখানে তার মুসলিম ভাইদেরকে তাদের মধ্যে প্রচলিত বিদআত ও হিন্দুয়ানা আক্বিদা পরিহার করে বিশুদ্ধ ইসলামের মূলনীতির প্রতি ঈমান আনয়নের দাওয়াত দেন।
ওহাবীবাদ প্রচারক সাইয়েদ আহমদের নেতৃত্বে এসব ওহাবী মুসলমানরা জিহাদের এক পর্যায়ে পাঞ্জাবে ওহাবী মূলনীতি স্থিত ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়।
এ হুকুমত দীর্ঘস্থায়ী হলনা। যাবতনা উনবিংশ শতকের চতুর্থ দশকে ইংরেজ উপনিবেশবাদ তা ধ্বংস করে দেয়। 
কিন্তু ওহাবী আন্দোলন সাইয়েদ আহমদ বেরলভীর পরেও তার খলিফাদের হাতে এখানে প্রতিষ্ঠিত থাকে। ইংরেজ উপনিবেশবাদীরা তা পুরোপুরি ধ্বংস করতে সক্ষম হয়নি। এ অঞ্চলের অনেক অধিবাসী ওহাবী ভাবধারার ইসলামে সর্বদা অনুগত হয়ে চলছে”। (পৃষ্ঠা-৭৮-৭৯)
উক্ত উদ্ধৃতিটি ফদ্বলে রাসূল বাদায়ুনী কিংবা কোন সুন্নী আলেমের লিখিত নয় যে, সৈয়্যদ সাহেবের গায়ে কলংক লেপন বলে ওড়িয়ে দেওয়া যাবে। এটি কাতার শরয়ী বিচারদালতের বিচারকের রায় এবং ইবনে আব্দে ওহাবের মদদপুষ্ট সাউদী প্রেসিডেন্ট আব্দুল আযীযের সুযোগ্য পুত্র প্রেসিডেন্ট ফায়সালের নির্দেশে মক্কা মুকাররমাহ’স্থ সাউদী রাষ্ট্রীয় প্রেসে মুদ্রিত সনদ। এ-তো শত্রু প্রদত্ত কলংক তিলক নয়, মিত্রের দেওয়া  রাজটিকা।
উক্ত বর্ণনালোকে নিশ্চিত ধারণা পাওয়া যায় যে, সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী প্রতিষ্ঠিত ত্বরীকায়ে মুহাম্মদীয়া বা মুহাম্মদী আন্দোলন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর সংস্কার আন্দোলন নামের নৃশংসতার ভারতীয় সংস্করণই মাত্র। তার পরিচালিত যুদ্ধ  ইসলাম ও নির্যাতিত মুসলিমদের রক্ষার তাগিদে নয় বরং ওহাবীয়্যাত প্রতিষ্ঠা ও ইংরেজ স্বার্থ রক্ষার গরজেই।
উপমহাদেশে শিখ কর্তৃক মুসলিম নির্যাতন-নিষ্পেষণের ইতিহাস যেমন চরম সত্য, তেমনি শিখদের বিরুদ্ধে সৈয়্যদ সাহেবের কথিত জিহাদ সহজ সরল মুসলমানদের আবেগ কাজে লাগিয়ে ওহাবীয়্যাত প্রতিষ্ঠার মনোবৃত্তি চরিতার্থ ও ইংরেজ তোষামোদের কুটকৌশলই মাত্র।প্রমাণ স্বরূপ পর্যবেক্ষণ করুন,
‘সৈয়্যদ সাহেবের নিকট মুজাহেদীনরা একত্রিত হতে থাকলে তিনি মাওলনা ইসমাঈলের পরামর্শে ইলাহাবাদের সর্দার গোলাম আলী মারফত উত্তর পশ্চিম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্ণরের খেদমতে অবগত করলেন যে, আমরা শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছি; এতে সরকারের-তো আপত্তির কিছু নেই? লেফটেন্যান্ট গভর্ণরও পরিষ্কার লিখে দিলেন, আমাদের শাসন ও নিরাপত্তায় বিঘ্নতা না ঘটলে আমাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই’। (মির্যা হায়রাত দেহলভী রচিত ফারুকী প্রেস-দিল্লী মুদ্রিত হায়াতে তৈয়্যবাহ ৩০২ পৃষ্ঠা)
নমস্য পাঠক! সৈয়্যদ সাহেবের এ যুদ্ধ-প্রস্তুতি কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রয়োজনে, নাকি ইংরেজ বাহদুরের ইশারা-ইঙ্গিত ও অনুমতি সাপেক্ষে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য? উক্ত উদ্ধৃতি আলোকে কি প্রতিভাত হয়? এ কথাই কি ষ্পষ্ট নয়, এক অধীন ভৃত্য যেন আপন মনিবের দরবারে আপাদমস্তক বিনয় হয়ে নিবেদন জানাচ্ছে যে, হুযুর! যদি অনুমতি প্রদান করেন তবে যুদ্ধ-প্রস্তুতি নেওয়া হবে অন্যথায় কুরআন-হাদীসকে তাকে তুলে তালা মেরে রাখা হবে!
অবশ্য ইংরেজ লেফটেন্যান্ট গভর্ণর নিজেদের শাসন ও নিরাপত্তার কথা স্মরণ করিয়ে না দিলেও পারতেন। কেননা সৈয়্যদ ও শাহ সাহেবের মনোপ্রাণে, সর্বদা ইংরেজদের স্বার্থ রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় বদ্ধমূল ছিল। সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী সাহেবের উক্তি দেখুন, ‘ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে কেন যুদ্ধ করবো? শরীয়তের মূলনীতির বিপরীত অহেতুক কেন উভয় পক্ষের রক্ত প্রবাহিত করবো?’ (মুহাম্মদ জা’ফর থানেশ্বরী রচিত, ফারুকী প্রেস হতে মুদ্রিত তাওয়ারীখে আজীবাহ ৯০ পৃষ্ঠা)
এবার শাহ সাহেবের ভাষণও একটু পর্যবেক্ষণ করুন, ‘কলিকাতায় মাওলানা ইসমাঈল যখন জিহাদের ওয়ায শুরু করলেন এবং শিখদের অত্যাচারের করুণ চিত্র তুলে ধরতে লাগলেন, তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফতওয়া কেন দিচ্ছেন না? প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, তাদের সাথে জিহাদ কোন ভাবেই ওয়াজিব নয়; একেত আমরা তাদের প্রজা, দ্বিতীয়ত আমাদের ধর্মীয় আরকান বা মৌলিক বিধি-বিধান পালনে তারা ন্যূনতম হস্তক্ষেপও করছেনা। তাদের রাজত্বে আমাদের সর্বপ্রকার স্বাধীনতা সংরক্ষিত। বরং তাদের ওপর কেউ হামলা করলে মুসলমানদের ওপর ফরয যে, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং আপন সরকারের গায়ে আঁচড় লাগতে না দেওয়া’। (হায়াতে তৈয়্যবাহ ২৯৬ পৃষ্ঠা, তাওয়ারীখে আজীবাহ ৭৩ পৃষ্ঠা)।
সৈয়্যদ ও শাহ সাহেবের শিখ বিরোধী যুদ্ধ সরকারের গায়ে আঁচড় লাগতে না দেওয়ার ফরয বা আবশ্যক আদায়ে ছিল কিনা, ইতিহাসের দর্পণে অবলোকন করুন।
‘আলোচিত ঘটনাবলী ও গ্রথিত পত্রাবলীর সূত্রে পরিস্কার জানা যায় যে, ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ইচ্ছা সৈয়্যদ সাহেবের কখনো ছিলনা। তিনি ওই মুক্ত হুকুমতকে নিজেরই হুকুমত মনে করতেন। এতে সন্দেহ নেই যে, যদি ইংরেজ সরকার তখন সৈয়্যদ সাহেবের বিপক্ষে হতো, তবে হিন্দুস্তান হতে সৈয়্যদ সাহেবের নিকট কোন সাহায্যই পৌঁছতোনা। কিন্তু ইংরেজ সরকার তখন মনোপ্রাণে শিখ-শক্তির হ্রাস কামনা করছিল’। (তাওয়ারীখে আজীবাহ ১৮২ পৃষ্ঠা)।
সম্মানিত পাঠক! এ সে ইংরেজ শাসন, যাতে শাহ যফরের ছেলের মস্তক পিতার নাস্তার জন্য প্রেরণ, অসংখ্য ওলামাকে ফাঁসির কাষ্টে ঝুলানো এবং মসজিদ ও খানকাহসমূহের মর্যাদা হানিসহ অত্যাচার-অবিচারের অনুসম অংশও বাদ যায়নি। পরন্তু এ আযাদ হুকুমত বা শাসনকে সৈয়্যদ সাহেব নিজেরই হুকুমত জ্ঞান করতেন! তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ শরীয়তের মূলনীতির খেলাফ আর সহস্র মাইল দূরের শিখ সর্বোপরি ইয়াগিস্তানের হাকেম ইয়ার মুহাম্মদ ও আফগানী পাঠান মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ-জিহাদ আইনে ইসলাম! হায়রে জিহাদ!
সৈয়্যদ ও শাহ সাহেবের জিহাদ ইংরেজ সরকারের ওপর আঁচড় না লাগার জিহাদ ছিল বলেই- তো ইংরেজ কর্তৃক পাদ্রী সাহেবের সম্মানে রাজভোজের আয়োজন। নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি গভীর মনোযোগে পড়ুন।
‘এতটুকুতে দেখতে পেলাম যে, ঘোড়-সাওয়ার ইংরেজ কয়েক পাল্কী খানা নিয়ে নৌকার নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল, পাদ্রী সাহেব কোথায়! হযরত নৌকা হতে উত্তর দিলেন, আমি এখানে আছি। ইংরেজ ঘোড়া হতে অবতরণ করে টুপি হাতে নিয়ে নৌকায় পৌঁছে কুশল বিনিময়ের পর বলল, আপনার আগমন অবগত করার জন্য তিন দিন ধরে এখানে চাকর দাঁড় করিয়ে রেখেছি। আজ সে সংবাদ দিল, সম্ভবত হযরত আজ কাফেলাসহ আপনার বাড়ির সম্মুখে পৌঁছতে পারেন। এ সংবাদ পেয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত আহার তৈরিতে নিয়োজিত রয়েছি। সৈয়্যদ সাহেব খাদ্য সামগ্রী নিজেদের বর্তনে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। খাদ্য নিয়ে কাফেলায় বন্টন করে দেওয়া হল। ইংরেজ সাহেব দু’তিন ঘন্টা অবস্থান করে চলে গেলেন’। (মৌলভী আবুল হাসান আলী নদভী রচিত সীরাতে সৈয়্যদ আহমদ ১ম খণ্ড ১৯০ পৃষ্ঠা)।
মাননীয় পাঠক! যুদ্ধে যাচ্ছেন সৈয়্যদ ও শাহ সাহেব আর রসদ যোগান দিচ্ছেন ইংরেজ সাহেব! সম্বোধনও আবার পাদ্রী, তাতে হাজির বলে সাড়া দিচ্ছেন সৈয়্যদ সাহেব! টুপি খুলে পাদ্রী সুলভ সম্ভাষণেও আপত্তি নেই বরং দু’তিন ঘন্টা একান্ত আলোচনায় ব্যাপৃত রইলেন!
আর ওই তথাকথিত শিখ দমন যুদ্ধাভিযানেই জিহাদে অবতীর্ণ হচ্ছেন, মুসলিমদের সাথে। আঁখি মেলে দেখুন,
‘হযরত মৌলভী রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী সাহেব এ ধারাবাহিকতায় বলেন যে, আম্বট নিবাসী হাফেয জানী আমার নিকট বর্ণনা করেছিলেন, আমি কাফেলার সঙ্গে ছিলাম। সৈয়্যদ সাহেব থেকে মুহূর্তে-মুহূর্তে বহু কারামত দেখেছি। মৌলভী আব্দুল হাই লৌক্ষ্ণভী, মৌলভী ইসমাঈল দেহলভী ও মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন  রামপুরী সাহেবানরাও সঙ্গে ছিলেন। তারা সবাই সৈয়্যদ সাহেবের সাথে জিহাদে অংশ নিয়েছিলেন। সৈয়্যদ সাহেব প্রথম যুদ্ধ ইয়াগিস্তানের হাকেম ইয়ার মুহাম্মদের সাথে করেছিলেন’। (তাযকিরাতুর রশীদ ২য় খণ্ড ২৭০ পৃষ্ঠা)।
বিজ্ঞ পাঠক! বিচার করুন যে, ইয়াগিস্তান কোন মুসলিম রাজ্য, না শিখরাজ্য? ইয়ার মুহাম্মদ কোন মুসলিমের নাম, না কোন শিখ সর্দারজীর? উপমহাদেশের মুসলিম রমণীদের অলংকার আর মুষ্টিচাল বেচা টাকা কিন্তু কোন আফগানী মুসলিমের সাথে জিহাদের জন্য দেওয়া হয়নি। হাজার-হাজার মুসলমান, আফগানীদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সৈয়্যদ সাহেবের বাহিনীতে যোগদান করেনি।
উদ্ধৃত উক্তি ফদ্বলে রাসূল বাদায়ুনী কিংবা কোন সুন্নী মাওলানার নয় যে, সৈয়্যদ সাহেবের অবদানকে খাটো করার অপতৎপরতা বলে ওড়িয়ে দেওয়া হবে। উক্ত বর্ণনাতো দেওবন্দীদের ‘মাওলা’ ‘হাদী’ ‘শায়খে রব্বানী’ রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী সাহেবের। যার মৃত্যুতে দেওবন্দ দারুল উলুমের প্রধান মুদাররিস মৌলভী মাহমদুল হাসান সাহেব শোকগীতি লিখে স্বীয় ভক্তি-স্তুতি প্রকাশ করেছেন। সে শোকগীতির একটি চরণ দেখুন,
‘খোদা উনকা মুরব্বী ওয়ে মুরব্বী খলায়িখ কে, মেরে মাওলা মেরে হাদী থে বেশক শায়খে রব্বানী’।
অবশেষে সৈয়্যদ সাহেব নিজের কুটচাল ঢাকা এবং ইংরেজদের মনোরঞ্জনের গরজে শিখদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন ঠিকই; ততদিনে কিন্তু সৈয়্যদ সাহেব বাহিনী ও আফগানী হাকেমের সেনাদলের সহস্র মুসলিমের রক্তে গঙ্গা বয়ে গিয়েছে। এতে-ও তার রক্ত-তৃষ্ণা মিটলনা। অবশেষে অনভিজ্ঞ মুসলমানদেরকে শত্রুদের তরবারীর নীচে বলির পাঁঠা রূপে রেখে পলায়ন, নিবেদিত প্রাণ ভক্তদের ভাষায়- অদৃশ্য হলেন। দেওবন্দীদের হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী সাহেব সংকলিত আরওয়াহে সালাসার বর্ণনা লক্ষ্য করুন।
‘অতঃপর কিছু দিন বাদে লাহুর গভর্ণর রঞ্জিত সিংয়ের ছেলে কড়ক সিংয়ের সাথে যুদ্ধ হল। যাতে বহু মুজাহেদীন প্রাণ হারালেন। হযরত মৌলভী মুহাম্মদ ইসমাঈল সাহেব ও মৌলভী মুহাম্মদ হাসান সাহেবও তথা শহীদ হলেন। অবশ্য যুদ্ধক্ষেত্র মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে রইল। লাশসমূহ একত্রিত করা হলে সৈয়্যদ সাহেব ও তার সাথীদের খোঁজ মিললনা। লোকেরা এদিক ওইদিক অনুসন্ধানে রত রইল। কতেক ব্যক্তি বিভিন্ন গ্রাম ও পাহাড়ে গিয়ে অনুসন্ধান করতো কিন্তু কেউ নাগাল পেতোনা। গ্রামে বরাবরই সন্ধান মিলতো যে, এখানে ছিল-ওখানে ছিল। এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছে যে, আমার কঠিন জ্বর ছিল। এমতাবস্থায় আমি তিন ব্যক্তিকে যেতে দেখি। তাদের একজন সৈয়্যদ সাহেব। আমি শোর করলাম যে, হযরত! আপনি আমাদের কোথায় রেখে গেলেন এবং কেন আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেলেন? সবাই আপনার পথ চেয়ে আছে। আমার শোরগোলে হযরত মুখ ফিরিয়ে আমাকে দেখলেন কিন্তু কোন উত্তর না দিয়েই চলে গেলেন। আমি কঠিন অসুস্থতা হেতু ওঠতে পারিনি শুধু শোরগোল করতে রইলাম। 
দ্বিতীয় এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছে যে, আমি ওই সময় সৈয়্যদ সাহেবকে এক পাহাড়ে তালাশ করছিলাম। একবার একটু তফাতে শব্দ পেয়ে ওখানে গেলে দেখি যে, সৈয়্যদ সাহেব ও তার দুই সহযাত্রী বসে আছেন। আমি সালাম ও মুসাফাহা করে আরজ করলাম যে, হযরত! কেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন? আপনি বিহীন সবাই চিন্তাকাতর। অগত্যা আমরা অমুক ব্যক্তিকে আপনার খলিফা বানিয়ে তার নিকট বাই‘আত নিয়েছি। এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বল্লেন, এখন আমার ওপর অদৃশ্য থাকার নির্দেশ হয়েছে; তাই আসতে পারছিনা। এতটুকু বলে কাফেলার ভালমন্দ জিজ্ঞাসা করে যাত্রা দিলেন। আমিও সঙ্গী হওয়ার আবেদন জানালে নিষেধ করলেন। তবুও আমি পিছু নিতে চাইলে হাত-পা অবশ হয়ে যায়। আমি হতবাক দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে রইলাম যে,হায় আল্লাহ! কী করে চলবো! আর সৈয়্যদ সাহেব সঙ্গীসহ অদৃশ্য হয়ে গেলেন। 
তৃতীয় এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছে যে, সৈয়্যদ সাহেবকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা এক গ্রামের একটি যায়গায় পৌঁছলাম। ওখানে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে, এ সদ্য ভগ্ন তাজা কবরটি সৈয়্যদ সাহেব এক্ষুণি ধ্বসিয়ে দিয়েছেন; কেননা এটি উঁচু ছিল। এদিক ওইদিক দেখলামতো কোথাও দেখা গেলনা’। (আরওয়াহে সালাসা, যা বর্তমানে কুতুবখানা নঈমীয়্যাহ দেওবন্দ থেকে হিকায়াতে আউলিয়া নামে প্রকাশিত, পৃষ্ঠা ১৬০-১৬১)
প্রিয় পাঠক! দেখলেনতো, সহজ-সরল অনভিজ্ঞ মুসলমানদেরকে তরবারীর ঝঙ্কার ও তীরের বারিপাতে শ্বাস রুদ্ধকর ভয়াবহ ময়দানে অভিভাবকহীন অসহায় ছেড়ে সৈয়্যদ সাহেব প্রাণ নিয়ে আত্মগোপন করলেন! তা-ও নাকি কার নির্দেশে। এ কাপুরুষোচিত কর্মকে আমরা পলায়ন না বলে দেওবন্দী বুযুর্গদের ন্যায় কারামতের রঙ মেখে সঙ সাজিয়ে অদৃশ্য হওয়া বললেও প্রশ্ন দেখা দেয় যে, একজন মুসলিমের একটি উঁচু কবর ভেঙ্গে লেবেল করা তথা কথিত আমিরুল মু’মেনীনের বড় কর্তব্য, না শত্রুর সাথে যুদ্ধরত মুসলমানের  নেতৃত্ব দেওয়া? অলৌকিক শক্তির জোর ও বীরত্ব শিখদের সাথে না দেখিয়ে একজন মৃত মুসলিমের কবরের সাথে কেন? এটি সালেহীনদের মাযারাত ধ্বংসের ইবনে আব্দে ওহাবের ওহাবীয়্যাত বা সংস্কার আন্দোলন নামক নাটকের নব মঞ্চায়ন নয় কী?
মূল্যবান সময়ের অপচয় মনে না হলে উদ্ধৃত ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণাদির ভিত্তিতে পুরো ঘটনা মিলিয়ে নিয়ে আপন বিবেকের মানদণ্ডে বিচার করে দেখুন,
শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে সহজ-সরল মুসলমানদের বোকা বানিয়ে মুজাহিদ বাহিনী গড়া, ধনী-দরিদ্র সর্বস্তরের মুসলমানদের চাঁদা এমনকি মহিলাদের অলংকার ও মুষ্টিচাল বেচা টাকা পর্যন্ত হাতানো, যুদ্ধের জন্য ইংরেজদের অনুমতি প্রার্থনা, ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ধর্মের মূলনীতি বিরুদ্ধ ঘোষণা, ইংরেজদের শত্রুর মোকাবিলা ফরয ফতওয়া, ইংরেজ শাসনকে আপন শাসন জ্ঞান, ইংরেজ কর্তৃক পাদ্রী সম্ভাষণে সন্তুষ্টি, তাদের প্রদত্ত খাবার স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ, তাদের সাথে দু’তিন ঘন্টা একান্ত আলোচনা, বিদ্রোহীতার অজুহাতে জিহাদ নামে পাঠান মুসলিম নিধনযজ্ঞ, ইংরেজদের স্বার্থে শিখদের সাথে যুদ্ধে শত্রু বাহিনীর তরবারী তলে হাজারো অনভিজ্ঞ মুসলিমদের অসহায় ফেলে পলায়ন এবং গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে-ফিরে উঁচু কবর ভেঙ্গে সমান করা ইত্যাদি ইত্যাদি কী একজন আমিরুল মু’মিনীনের জন্য শোভনীয়?
ইমারতের ঘোমটায় এ নিষ্ঠুরতার মুখোশ হাশর ময়দানে অবশ্য খসে পড়বে, যে দিন আল্লাহর বিচারাদালতে লক্ষ ফরিয়াদী মুসলমান একজন মাত্র অপরাধীর দিকে ইঙ্গিত করে শত সহস্র মুখে এক বাক্যে রক্তের বিনিময় প্রার্থনা করবে।